সৃষ্টিকর্তা হয়তো এবার সিয়াটলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প লিখতে চেয়েছিলেন। চলতি বিশ্বকাপটি যখন গোলকিপারদের অতিমানবীয় সব সেভ আর অবিশ্বাস্য বীরত্বের জন্য চেনা যাচ্ছে, ঠিক তখনই ফুটবলবিশ্ব দেখল উল্টো এক ছবি। ভোজিনহা, অরল্যান্ডো গিল কিংবা এলয় রুমরা যখন গোলপোস্টের নিচে অভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলছেন, তখন উরুগুয়ের ফার্নান্দো মুসলেরার গ্লাভস ফসকানো ভুলকেও ম্লান করে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাট ফ্রিজ। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর নকআউট মঞ্চে তার এক মুহূর্তের ‘ব্ল্যাকআউট’ স্তব্ধ করে দিল পুরো সিয়াটলকে। বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলের বড় হারে শেষ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন।
ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার ম্যাট আপসনের চোখে এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়, ছিল এক নিখাদ ‘হরর শো’। ফ্রিজের এই অবিশ্বাস্য ভুল দেখে আপসন মন্তব্য করেন, ‘ফ্রিজ আসলে কী ভাবছিল কে জানে!’
ম্যাচের বয়স তখন ৫৭ মিনিট। ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র তখনো ম্যাচ সমতায় ফেরানোর জন্য মরিয়া। ঠিক এমন সময়ই বেলজিয়ামের বাঁ প্রান্ত থেকে রক্ষণভাগের পেছনে একটি পাস উড়ে আসে। হাই-লাইন ডিফেন্সে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তিন ডিফেন্ডার যখন বেলজিয়াম ফরোয়ার্ড চার্লস ডি কেটেলারাকে রুখতে দৌড়াচ্ছেন, তখন ডি-বক্স ছেড়ে বেরিয়ে আসেন গোলকিপার ফ্রিজও।
প্রাথমিকভাবে বুক দিয়ে বলের গতিরোধ করে ফ্রিজ বিপদ সামাল দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু এর পরের কয়েক সেকেন্ডেই তিনি উপহার দেন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় ব্লুপার। বাঁ পায়ে বলটি ক্লিয়ার করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন; শট নিতে গিয়ে তার পা মাটিতে আটকে যায়। এই সামান্য কালক্ষেপণই ডেকে আনে বিপর্যয়। পাশের সতীর্থকে পাস দিতে গিয়ে বল তুলে দেন কেটেলারার পায়ে। সেখান থেকে বল পান বেলজিয়াম মিডফিল্ডার হান্স ফানাকান। সামনে গোলকিপার নেই, পোস্ট পুরোপুরি ফাঁকা। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে ঠাণ্ডা মাথায় ফানাকানের নেওয়া শটটি ডিফেন্ডার টিম রিমের মরিয়া চেষ্টাকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। ম্যাচ থেকে তখনই ছিটকে যায় যুক্তরাষ্ট্র।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে পড়া ২৭ বছর বয়সি ম্যাট ফ্রিজ মাঠের বাইরের জটিল সব হিসাব-নিকাশ মেলাতে পারলেও মাঠের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক চাপ মেলাতে পারলেন না। ম্যাচ শেষে ইয়াহু স্পোর্টসের স্টিভেন গফকে নিজের ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফ্রিজ বলেন, ‘তৃতীয় গোলে ভুল সিদ্ধান্তে নিজের যে দায়, তাতে স্পষ্টই আমি হতাশ। কেটেলারাকে এতটাই কাছে মনে হয়েছিল যে, ভেবেছি আমার পায়ে হয়তো লাথি মারবে। তাই আমি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।’
শারীরিক আঘাত পাওয়ার এই ক্ষণিকের ভয়টাই মূলত ফ্রিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে অসার করে দিয়েছিল। আর তার খেসারত দিতে হলো পুরো দলকে।
ফানাকানের এই গোলের পর ম্যাচ পুরোপুরি বেলজিয়ামের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তীতে রোমেলু লুকাকুর গোল যুক্তরাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। ৪-১ ব্যবধানের দুর্দান্ত জয়ে বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখলেও মাঠের মধ্যে মাথায় হাত দিয়ে ফ্রিজের দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি মার্কিন ফুটবলের ইতিহাসে এক চরম আক্ষেপের দলিল হয়ে রইল।