ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্নটা সবাই দেখে, কিন্তু বাছাই পর্বের কঠিন বৈতরণী পার হওয়া নেহাতি সোজা কথা নয়। তবে এবার ৪৮ দলের ফরম্যাট আসায় তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। চিরাচরিত পরাশক্তিদের ভিড়ে এবার বিশ্ববাসী দেখবে কিছু নতুন মুখ, যাদের গল্প যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়।
উজবেকিস্তানের আক্ষেপ মোচন
এশিয়ার ফুটবলে বরাবরই সমীহ জাগানিয়া দল উজবেকিস্তান। তবে প্রতিবারই বিশ্বকাপের মূল পর্বের খুব কাছ থেকে ফিরে আসতে হতো তাদের। ২০০৬ এবং ২০১৪ সালের বাছাই পর্বে একদম শেষ মুহূর্তে এসে ভেঙেছিল উজবেকদের হৃদয়। অবশেষে সব আক্ষেপ ঘুচিয়ে মধ্য এশিয়ার এই দেশটি এবার সরাসরি টিকিট কেটেছে বিশ্বকাপের। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে বড় অবদান রাখছেন একঝাঁক তরুণ তুর্কি। বিশেষ করে ফরাসি ক্লাব লঁস-এ খেলা প্রতিভাবান তরুণ ডিফেন্ডার আবদুখোদির খুসানভ রক্ষণভাগে দলটির বড় ভরসা। ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে প্রথম উজবেক হিসেবে নজর কাড়া খুসানভ এবার বিশ্বমঞ্চে উজবেকিস্তানের ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রস্তুত।
জর্ডানের চার দশকের স্বপ্নপূরণ
প্রায় চার দশক আগে ১৯৮৬ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের এশিয়ান বাছাই পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে এএফসি গ্রুপ ‘বি’ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার পেছনে রানার্সআপ হিসেবে মূল পর্ব নিশ্চিত করেছে তারা। জর্ডানের এই ফুটবল বিপ্লব কিন্তু হুট করে হয়নি। দলটির ফুটবল কাঠামো তৈরিতে হ্যারি রেডনাপের মতো অভিজ্ঞ ইংলিশ কোচরা অতীতে ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৮ সালের বাছাই পর্বে রেডনাপের অধীনে তারা বাংলাদেশকে ৮-০ গোলে হারালেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরেছিল। তবে সেই ভাঙা-গড়ার পথ পেরিয়ে বর্তমান দলটি এখন এক সুসংহত শক্তি, যারা এবার বিশ্বকে চমকে দিতে তৈরি।
কুরাসাও : ছোট্ট দ্বীপের এক মহাকাব্য
ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র কুরাসাও এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক। জ্যামাইকার বিপক্ষে ড্র করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে ভেনেজুয়েলা উপকূল থেকে মাত্র ৩৭ মাইল দূরের এই দ্বীপটি। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস ভেঙে যাওয়ার পর স্বশাসিত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো! এক সময় ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৫০-এর নিচে থাকা দলটি এখন রয়েছে ৮০-এর ঘরে। দলটির এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের রূপকার ৭৮ বছর বয়সি ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে প্রবীণ কোচ হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাওয়া অ্যাডভোকাটের মস্তিষ্কে ভর করেই এই খুদে দেশটি এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর।
কেপ ভার্দে : লিংকডইনে মিলেছে বিশ্বকাপের টিকিট!
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের মাত্র ছয় লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে। এসওয়াতিনিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে তারা। ১৯৯০ সাল থেকে চেষ্টা করতে করতে আজ তারা এই অবস্থানে। তবে তাদের সফলতার পেছনের গল্পটা বেশ অভিনব। ইউরোপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কেপ ভার্দে বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করে জাতীয় দলে ভেড়ানোর দারুণ এক কৌশল নেয় তারা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেস। আয়ারল্যান্ডের ক্লাব শ্যামরক রোভার্সের এই অভিজ্ঞ ফুটবলারকে কোনো স্কাউট বা ট্রায়াল দিয়ে নয়, বরং খুঁজে নেওয়া হয়েছিল পেশাদার যোগাযোগ মাধ্যম লিংকডইনের মাধ্যমে! বাবার সূত্রে কেপ ভার্দের হয়ে খেলার প্রস্তাব লিংকডইনে পাওয়ার পর লোপেসও লুফে নেন। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া আরো ছয়জন ফুটবলারসহ এই বহুজাতিক মিশ্রণের দলটিই এখন কাঁপাবে বিশ্বকাপের মাঠ।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়; বিশ্বকাপ মানে কুরাসাও বা কেপ ভার্দের মতো ক্ষুদ্র দেশের কোটি টাকার স্বপ্ন, জর্ডান কিংবা উজবেকিস্তানের বহু বছরের কান্নার অবসান। ১১ জুন যখন রেফারি বাঁশি বাজাবেন, তখন এই দলগুলোর প্রতিটি পাস, প্রতিটি গোল ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক একটি মহাকাব্য রচনা করবে। ৪৮ দলের এই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ তাই ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এক পরম পাওয়ার আসর হতে যাচ্ছে।