হোম > খেলা > ফুটবল

যুদ্ধ, রাজনীতি ও অর্থের কালো ছায়ায় বিশ্বকাপ

আরিফুল হক বিজয়

বিশ্বকাপের পর্দা উঠে গেছে রাতেই। ইতোমধ্যে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচের ফলাফল জেনে গেছেন দর্শকরা। জমকালো আয়োজনে চোখধাঁধানো আতশবাজির রোশনাইয়ের এক ঝলক ছুঁয়ে গেছে মহামঞ্চের মহারণ। শেষ হয়েছে ৪৮ সীমান্তের ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষার প্রহর। কিন্তু এখানে হিসাবটা ভুল আছে! ফুটবলের এই মহোৎসব ৪৮ সীমান্তের প্রতিটি প্রান্ত ঠিক ছুঁয়ে যেতে পারেনি। এতশত রোমাঞ্চের মাঝেও বিরাট এক প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিয়েছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ভূমিতে আয়োজিত এই আসরকে ঘিরে রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও বাণিজ্যিক বিতর্কের রেশ রয়েই গেছে! আলোচনা-সমালোচনা চলছে সমানে।

২০১৮ সালে এই তিন দেশকে যৌথ আয়োজক হিসেবে নির্বাচনকালে ‘নিম্ন ঝুঁকি’ হিসেবেই দেখিয়েছিল ফিফা। সেই সঙ্গে ‘পরিচালনাগতভাবে সবচেয়ে নিরাপদ’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। পাশাপাশি ১৪ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড আয়ও ছিল ফিফার বড় লক্ষ্য। যদিও আয়ের দিকটি এখন সম্ভাব্য ১১ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই আছে! তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই একের পর এক ঘটনা বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী একটি দেশের বিরুদ্ধে আয়োজক দেশের সামরিক অভিযান বিশ্বকাপ ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। সংঘাতের জেরে ইরানি কর্মকর্তাদের ভিসা জটিলতা, দলীয় প্রস্তুতিতে বাধা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ বিশ্বকাপকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এমন পরিস্থিতি অতীতে অন্য কোনো আয়োজক দেশের ক্ষেত্রে দেখা গেলে বিশ্বকাপ সরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠতে পারত।

সংকট শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বকাপ শুরুর আগে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও ম্যাচ অফিসিয়ালদের ভিসা জটিলতা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান এবং কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। এছাড়া ইরাক, সেনেগাল ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিদেরও অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম শর্ত হলো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ফলে এসব ঘটনা ফিফার অবস্থান এবং আয়োজক দেশের দায়িত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ফিফা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার কথা বললেও ইনফান্তিনোর বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ফিফার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিশ্বকাপের আগে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, অভিবাসন সংস্থা আইসিই (ICE)-এর কার্যক্রম বিদেশি সমর্থক ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি, গণগ্রেপ্তার এবং বাড়তি নজরদারির কারণে অনেক দর্শক নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক।

বিশ্বকাপ চলাকালে নিরাপত্তা ইস্যুও আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ড দলের বেস ক্যাম্পের কাছে বন্দুক হামলার ঘটনায় সেই শঙ্কা আরো বেড়েছে। অন্যদিকে মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় মাদকচক্র-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনাও আয়োজকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আয়োজক দেশগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে বিক্ষোভের সম্ভাবনা রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, নিরাপত্তার অজুহাতে এসব বিক্ষোভ দমন করা হতে পারে। একই সঙ্গে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীন মানুষদের শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপের ঝলমলে চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বাস্তব সামাজিক সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা চলছে। যেটা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং ৪৮ দলের অংশগ্রহণের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিবেশ-ব্যয়বহুল আসরগুলোর একটি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রায় ম্যাচ আয়োজনের বিষয়টিও খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আরেকটি বড় সমালোচনা টিকিট ও ভ্রমণব্যয় নিয়ে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, কোনো সমর্থক যদি নিজের দলকে ফাইনাল পর্যন্ত অনুসরণ করতে চান, তাহলে তার ব্যয় ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের উৎসব থেকে উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ আয়োজন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের এই আয়োজন টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতামূলক উত্তেজনা কমিয়ে দিতে পারে। এতে বিশ্বকাপের ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণ ও বিশেষত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্বকাপ ২০২৬ মাঠে শুরু হওয়ার আগেই রাজনীতি, মানবাধিকার, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো নানা ইস্যুতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ফলে অনেকের কাছেই প্রশ্ন এখন একটাই—বিশ্বকাপ কি এখনো শুধুই ফুটবলের উৎসব, নাকি এটি ক্রমেই বৈশ্বিক রাজনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতীক হওয়ার পথে? এর উত্তর মিলবে ৯ জুলাইয়ের পর। তবে বিতর্কের বিশ্বকাপ হিসেবে ২০২৬ আসর যে ইতোমধ্যে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, এ নিয়ে সংশয় নেই।

আজ মুখোমুখি কানাডা ও বসনিয়া

২৫ পাসের অনবদ্য গোলে প্রত্যাবর্তনীয় জয় দক্ষিণ কোরিয়ার

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘অননুমোদিত’ পতাকা বা স্লোগান উঠলেই ম্যাচ বন্ধ!

৯৬ বছর পর বিশ্বমঞ্চে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে

বিশ্বকাপে ৯৬ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভাঙলেন মোরা

তিন লাল কার্ডের ম্যাচ দিয়ে শুরু বিশ্বকাপ

এবারের বিশ্বকাপের প্রথম গোল মেক্সিকোর কিনিয়োনেসের

দুই যুগ পরে মরিনহো ফের রিয়াল মাদ্রিদে

অখ্যাত দেশের ‘বিখ্যাত’ তারকারা

মরক্কো ম্যাচে নেই নেইমার!