যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে ভৌগোলিক কোনো সীমারেখা না মেনেই তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ সতর্কবার্তা দেন মুজতবা খামেনি। তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যেকোনো মাত্রা বা ধরনের হুমকির জবাব তাৎক্ষণিক, কার্যকর ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাহীন হতে হবে।’
বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি, সেনাপ্রধান আমির হাতামি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ওয়াহিদি উপস্থিত ছিলেন।
মুজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার এটাই প্রথম প্রকাশ্যে আসা বৈঠক। গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তার বাবা ও তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বৈঠকে মুজতবা খামেনি সামরিক কর্মকর্তাদের ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দেন। তালিকায় ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রুর সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ’ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি। পারস্য উপসাগরের উপকূল, হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর এবং ইরানের সীমান্ত এলাকায় সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন হামলার ইঙ্গিত
ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা একাধিকবার বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও কার্যত ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছি। এখনো এক বা দুটি স্থাপনার বিষয়টি বাকি আছে। তবে ১০ মিনিটের মধ্যেই আমরা সেগুলো সামাল দিতে পারি।’
এ সময় ইরানের সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথা ভাবতে পারেন। ওই স্থাপনাও সামাল দিতে হবে। আমরা খুব দ্রুতই এসব করতে পারি।’
তবে ইরান সরকার ওই স্থাপনায় কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবার শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও দেশটিকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। শনিবারও তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে, যদিও দেশটির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখা যায় না।
ইরানের সরকার উৎখাতের কথা বলছেন নেতানিয়াহু
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি ইরানের সরকার উৎখাতের জন্য ‘ঐতিহাসিক ও একবারই পাওয়া যায় এমন সুযোগ’ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
গত ২২ অক্টোবর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বর্তমান সরকারকে চূড়ান্তভাবে উৎখাত করা ছাড়া দেশটি থেকে হুমকি দূর করার আর কোনো পথ নেই। তার অভিযোগ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবার পথ অনুসরণ করে আবারও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছেন।
এর আগে ১৪ অক্টোবর নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরাইলের নির্বাচনের আগে ইরানে আগাম হামলা চালানোর পক্ষে তিনি নন। তবে ইরান বা তাদের মিত্ররা ইসরাইলে হামলা চালালে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছিলেন তিনি।
ইসরাইলে গত মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। দেশগুলোকে শুধু হামলার প্রস্তুতি নয়, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা আঘাত মোকাবিলার ব্যবস্থাও নিতে বলা হয়েছে।
দুই কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিরা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। তবে নতুন হামলার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন করে অভিযান শুরু হলে তা কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে বলে মিত্র দেশগুলোকে জানানো হয়েছে। ইরান এবং দেশটির আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলো পাল্টা হামলা চালালে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের জবাবের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এ কারণে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করতে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, পেন্টাগন গত মাসের শেষ দিকে প্রায় ৯ হাজার সেনাসদস্য নিয়ে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট এবং মেরিন সেনা বহনকারী কয়েকটি উভচর যুদ্ধজাহাজ সান দিয়েগো থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরো বাড়তে পারে।
তবে নির্বাচনের পর কত দ্রুত মার্কিন বাহিনী নতুন অভিযান শুরু করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
রুবিও বললেন, সামরিক অভিযান নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প
ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। শনিবার আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
রুবিও বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। এ বিষয়ে আজ আপনাদের জানানোর মতো কোনো ঘোষণা আমার কাছে নেই। আর আমরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছি না।’
তবে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব হলে আমরা তাতে আগ্রহী থাকব।’
রুবিওর বক্তব্যে একদিকে সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার সুযোগ রাখার অবস্থান—দুটিই উঠে এসেছে।
কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা, সরাসরি বৈঠকে রাজি নয় তেহরান
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুক্রবার তেহরানে কাতারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা করেন ইরানের কর্মকর্তারা। এরপর শনিবার ইরানি আলোচকেরা কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে দোহায় বৈঠক করেন।
আলোচনার সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগও রয়েছে বলে এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত এক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ট্রাম্পের নির্দেশে পাঠানো ওই চিঠির উদ্দেশ্য ছিল আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং নতুন করে মার্কিন হামলা এড়ানোর পথ তৈরি করা বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, চিঠিটি তেহরানের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে আপাতত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই।
সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, ‘আমেরিকান পক্ষের সংলাপ শুরু এবং আরো বিস্তৃত সমঝোতার উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি।’ তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি এই চিঠির মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করে, তাহলে সেটি হবে তাদের আগের ভুলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া আরেকটি ভুল।
তিনি আরো বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমেরিকানদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো প্রয়োজন আমরা দেখছি না। আমাদের শর্তগুলো স্পষ্ট এবং মধ্যস্থতাকারীরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
কাতার ও পাকিস্তান বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। তবে এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি শর্ত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এর আগে ইরানের কাছে আস্থা তৈরির জন্য সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল। তবে তেহরান সেটিকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করেছে।
অন্যদিকে, ইরান গত সেপ্টেম্বর থেকে নিজেদের সাত দিনের একটি প্রস্তাব দিয়ে আসছে। এতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের সমর্থিত একটি নৌপথ ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়সীমা পাঁচ দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করার বিষয়ে কাতারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ইরানের অন্য শর্তের মধ্যে রয়েছে, ইসলামাবাদ সমঝোতার পর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড় পুনর্বহাল এবং কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের সব অর্থ ছাড় করা।
ওমানের সঙ্গে আলোচিত হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলের পথগুলোর স্বীকৃতিও দাবি করেছে তেহরান। আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, ইরানের সামনে আর কোনো ‘লাল রেখা’ নেই এবং দেশটি আত্মসমর্পণ করবে না।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, উদ্বিগ্ন আঞ্চলিক দেশগুলো
ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ আকারামিনিয়া শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুদ্ধের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের আগুন নিঃসন্দেহে আরো বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের জনগণের ক্ষতি করার সাহস দেখালে দেশটির শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী ‘ভূমিকম্পসম আঘাত’ হানবে।
এদিকে, বাহরাইনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলন মানামা ডায়ালগে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় দফার যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক হবে এবং তাতে কোনো সমাধান আসবে না। অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।’
একই সম্মেলনে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওয়ালিদ আলখেরেইজি বলেন, সামরিক উত্তেজনা ঠেকানো এবং সংকটের অবসানে আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রচেষ্টা চলছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল ঘিরে নতুন উত্তেজনা
যুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, শনিবার সকালে ‘মার্কিন শত্রুর’ একটি হামলায় মাছ ধরার নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কেশম দ্বীপের দুই জেলেকে খুঁজে পাওয়া গেছে। এর আগে প্রাদেশিক এক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছিল, ওই ঘটনায় আরও দুই জেলে আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে নিষিদ্ধ এলাকায় নৌমাইনে আঘাত লেগে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। এর আগে শুক্রবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছিল, কয়েকটি অনির্দিষ্ট ঘটনা বা মাইনে আঘাতের কারণে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া যোগাযোগের তার কেটে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইরান।
যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে মার্কিন নির্বাচনেও
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির প্রায় সব খাতে।
মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জ্বালানির বাড়তি দাম ও যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চাপ তৈরি করেছে বলে এপি জানিয়েছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করলে কংগ্রেসে ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হতে পারে। ফলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তেহরানের এক গৃহিণী ফরিবা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে সাধারণ ইরানিরা দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তবে রাজধানীর আরেক বাসিন্দা, চল্লিশোর্ধ্ব বিক্রয়কর্মী ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা আরেকটি যুদ্ধকে ভয় পাই না। আমরা তো ৪৮ বছর ধরেই যুদ্ধের মধ্যে আছি।’
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা, ইসরাইলের সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান এখনো স্পষ্ট।
সূত্র: এএফপি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ডন, রয়টার্স, আলজাজিরা ও ওয়াশিংটন পোস্ট