হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। অন্যদিকে জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
ছাড়ের বিনিময়ে কী পাচ্ছে ইরান
ইরানি আইনপ্রণেতার দাবি, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে তেহরান। কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করবে ইরান। তবে কাতারের জাহাজ চলাচলে কোনো মাশুল দিতে হবে না। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে মাশুল নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অবরোধের মধ্যেও প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা সংগ্রহের পাশাপাশি রাজস্ব আয় করতে চায় ইরান। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে চীন । ফলে চীনা জাহাজ থেকে মাশুল আদায় ইরানের জন্য বড় আয়ের উৎস হতে পারে।
৪ দেশের কাছে হরমুজ কেন গুরুত্বপূর্ণ
চারটি দেশই জ্বালানি পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। অক্টোবরে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল উপসাগরীয় অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে। এর ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।
ভারতের জন্য উপসাগরীয় তেল সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশটি ইরানের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের অন্যতম উৎস। কাতারের এলএনজি রপ্তানি এবং ইরাকের তেল পরিবহনও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে চায় ভারত ও কাতার। বিশেষ করে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কাতারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্ধান্তটি কি নতুন
সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি নতুন নয়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান বন্ধুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে শুরু করে। এপ্রিলে ইরাককে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটির জাহাজকে অব্যাহতি দেয় ইরানের সামরিক কমান্ড।
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রতিবেশী ইরাকের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাও তেহরানের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মার্কিন অবরোধের মধ্যেও কি জাহাজ চলতে পারবে
বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ওপর। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর থাকবে। তবে ইরানের বন্দরে যাতায়াত না করা জাহাজ এই অবরোধের আওতামুক্ত।
খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর মতো মানবিক সহায়তা পরিদর্শনের পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনায় এসব শর্তের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা।
তেলের বাজারে কী প্রভাব পড়বে
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত বিশ্ববাজারে তেলের দামে এই সিদ্ধান্তের বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। বাজার মূলত যুদ্ধের অবসান ও সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির দিকেই নজর রাখছে।
তবে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না। গত ৩০ অক্টোবর কাতারের এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ আল মায়েদা উপসাগরে অজ্ঞাত বস্তু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন ও যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ মাস।
আরএ