রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন নেতা নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নেতা দরকার, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করতে পারবেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্যও তিনি ইউক্রেনের এসব হামলাকে দায়ী করছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পরামর্শ দেব, তারা যেন এমন একজন নতুন নেতা বেছে নেয়, যিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।’ তার অভিযোগ, ‘কোনো এক কারণে জেলেনস্কি কখনোই তা করেন না।’
জেলেনস্কির নেতৃত্বে ইউক্রেনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প বলেন, দেশটি তার ৩০ শতাংশ ভূখণ্ড হারিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, এই যুদ্ধ কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না। এখন ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, জেলেনস্কির প্রতি ইউক্রেনের জনগণের সমর্থন রয়েছে। কে তাদের নেতা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তাদের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আসা এ ধরনের বক্তব্য বরং প্রমাণ করে, জেলেনস্কি তাঁর দায়িত্ব ঠিকভাবেই পালন করছেন। তাঁর সমর্থন পাওয়া উচিত।
রাশিয়ার ডিজেল কেনার চুক্তি
শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা জানান ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলেনস্কিকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্যও ইউক্রেনকে দায়ী করছেন তিনি। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই প্রভাবের বদলে ইউক্রেনের হামলাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ট্রাম্প বলেন, ২০২২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুই হতো না।
তার দাবি, অযোগ্যতার কারণে এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং এটি শুরু হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। গত চার দিনে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। ক্রমবর্ধমান হামলা মোকাবিলায় দেশটিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মস্কোর পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর সাড়ে চার বছরের বেশি সময় পরও দুই দেশের যুদ্ধ চলছে। দূরপাল্লার বিমান হামলা অব্যাহত থাকলেও স্থলযুদ্ধে সম্মুখসারিতে বড় ধরনের অগ্রগতি নেই।
ডিজেল চুক্তিতে ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি
শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরো ৫ লাখ টন এবং তার পরপরই ১০ লাখ টন সরবরাহ করা হবে। এর অল্প সময়ের মধ্যে আরো ৩০ লাখ টন ডিজেল দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেলেনস্কি। শনিবার জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার হামলার পর এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ রাশিয়া ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে জাপোরিঝঝিয়ায় আবাসিক ভবনে পাঁচটি গ্লাইড বোমা ফেলে।’
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানো হলে মস্কো সেটিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং শহরগুলোতে বোমা হামলা অব্যাহত রাখার সুযোগ হিসেবে দেখবে। তিনি বলেন, রপ্তানি থেকে রাশিয়ার আয় বাড়লে সেই অর্থ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ কেনা, ড্রোনের সক্ষমতা বাড়ানো, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং ভাড়াটে যোদ্ধা নিয়োগে ব্যয় করা হবে। রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা কমানো না গেলে মস্কো যুদ্ধ বন্ধ করতে প্রস্তুত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার বাড়তি আয় মোকাবিলায় ইউক্রেন বিভিন্ন পদক্ষেপ সমন্বয় করছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। আগামী কয়েক দিনে আরও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তিনি জানান, শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের জন্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেন গোলাবারুদ পাবে।
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল কেনার চুক্তিতে ইউরোপের মিত্ররা হতাশা প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিতে তারা অটল রয়েছে।
ট্রাম্পের এ চুক্তির ঘোষণা তার আগের নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। গত মাসেই তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে মস্কো যে তেল ও গ্যাস থেকে আয় করে, তা কমানোই ছিল ওই আইনের লক্ষ্য।
শুক্রবার ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার মিয়ামিতে ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতেই তাঁদের এ বৈঠক হয়। একই দিনে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
এএম