হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ১০ দিক

আনিসুর রহমান এরশাদ

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) সমসাময়িক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নেতাদের একজন। তার নেতৃত্বে সৌদি আরব এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব দেশটির অর্থনীতি, সমাজ, ধর্মীয় সংস্কৃতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর পড়ছে।

একদিকে তিনি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনোদন ও পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড, ইয়েমেন যুদ্ধ এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কারণে তার নেতৃত্ব সমালোচিত।

তাই এমবিএসকে কেবল আধুনিকায়নের প্রতীক কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসক—কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তার রাজনৈতিক ভূমিকার পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তার নেতৃত্বের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দশটি দিক বিবেচনা করলে সৌদি আরবের পরিবর্তনের প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হয়।

ইতিবাচক পাঁচটি দিক

১. তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বহুমুখী অর্থনীতির দিকে যাত্রা

এমবিএসের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো ভিশন ২০৩০। ২০১৬ সালে ঘোষিত এই পরিকল্পনার লক্ষ্য সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলের ওপর একক নির্ভরতা থেকে বের করে পর্যটন, শিল্প, প্রযুক্তি, খনিজ সম্পদ, সরবরাহব্যবস্থা, বিনোদন ও আর্থিক সেবার মতো খাতে সম্প্রসারণ করা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের সৌদি আরববিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর সংস্কার অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা কমিয়েছে, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে এবং অ-তেল খাতের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশ, যেখানে ২০১৬ সালে তা ছিল ৪৪ শতাংশ।

এটি সৌদি অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে তেল এখনো দেশটির রপ্তানি আয় ও সরকারি রাজস্বের প্রধান ভিত্তি। অর্থাৎ বৈচিত্র্য এসেছে, কিন্তু তেলনির্ভরতা শেষ হয়নি।

২. নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি

সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিনোদন ও জনপরিসরে চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারণ এমবিএস আমলের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০১৬ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরকারের ২০৩০ সালের লক্ষ্য ৪০ শতাংশ।

এই পরিবর্তন শুধু নারীর কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এটি পরিবার, ভোক্তা অর্থনীতি, সেবা খাত এবং সামাজিক কাঠামোতেও প্রভাব ফেলছে। তবে আইনগত সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

৩. পর্যটন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক পরিসর সম্প্রসারণ

সৌদি আরব দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিকভাবে প্রধানত হজ ও ওমরাহর গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ছিল। এমবিএস সেই পরিচয়ের পাশাপাশি দেশটিকে পর্যটন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, চলচ্চিত্র ও আন্তর্জাতিক বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন।

আল-উলা, লোহিত সাগর উপকূল, ঐতিহাসিক দিরিয়াহ, রিয়াদের বিনোদন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন এই পরিকল্পনার অংশ। ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্বও সৌদি আরব পেয়েছে।

এ ধরনের উদ্যোগ পর্যটন আয়, কর্মসংস্থান, হোটেল ব্যবসা, পরিবহন ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

৪. প্রশাসনিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি

সৌদি আরবের পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। এমবিএসের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা, ডিজিটাল সরকারি সেবা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

বিশেষ করে সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে বড় প্রকল্প পরিচালনা, নতুন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং বিভিন্ন খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ৬ জুলাই ২০২৬-এর গবেষণায় সৌদি আরবের ডিজিটাল সরকারি সেবা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সৌদি আরবের সক্রিয়তা ও বহুমুখী সম্পর্ক

এমবিএসের নেতৃত্বে সৌদি আরব শুধু যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে না; বরং চীন, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে। চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

একই সঙ্গে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে নিজের ভূমিকা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।

এতে সৌদি আরবের দর-কষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। তবে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকট দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি স্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও জরুরি।

নেতিবাচক পাঁচটি দিক

৬. রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ

এমবিএসের নেতৃত্বের অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তার হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। রাজপরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্য, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন।

২০১৭ সালে রিয়াদের রিটজ-কার্লটন হোটেলে রাজপরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তাদের আটক করা হয়েছিল। সরকার একে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলো আটক, সম্পদ হস্তান্তরে চাপ প্রয়োগ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টের ১০ মার্চ ২০২৫-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর বাস্তবায়ন যেমন প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়িয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণও ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও স্বাধীন মতামতের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৭. মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট

সৌদি আরবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার এগোলেও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একইভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। সরকারের সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ এবং মানবাধিকার নিয়ে সক্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের সৌদি আরববিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের কারণে সমালোচক ও মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘ কারাদণ্ড, অন্যায্য বিচার এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

এখানে এমবিএসের আধুনিকায়ন প্রকল্পের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। নাগরিকদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং সরকারের সমালোচনার অধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

৮. জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সংকট

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক ও ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড এমবিএসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত মূল্যায়নে বলেছিল, এমবিএস খাশোগিকে আটক বা হত্যার অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে তাদের ধারণা। এ মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল সৌদি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা। এমবিএস হত্যাকাণ্ডে নিজের দায় অস্বীকার করেছেন। সৌদি সরকারও হত্যাকাণ্ডের দায়ে কয়েকজনকে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের ২০১৯ সালের তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের জন্য সৌদি রাষ্ট্রের দায় এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছিল।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে একটি দেশের ভাবমূর্তি উন্নত করা গেলেও মানবাধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

৯. ইয়েমেন যুদ্ধ ও আঞ্চলিক মানবিক বিপর্যয়ের দায়

২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। তখন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে এমবিএস এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশটির প্রধান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হয়ে ওঠেন।

ইয়েমেনের সংঘাত শুধু সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

এই সংকটের জন্য শুধু সৌদি আরবকে দায়ী করা যাবে না। হুথি বাহিনী, ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষ, অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপ—সবই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করেছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা ও সামরিক অভিযানের ফলে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এমবিএসের জন্য এটি একটি বড় কৌশলগত শিক্ষা: সামরিক শক্তি দিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও মানবিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

১০. মেগা প্রকল্পের উচ্চাভিলাষ, ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

এমবিএসের ভিশন ২০৩০-এর সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি হলো নিওম। এর অধীনে দ্য লাইন, অক্সাগন ও ট্রোজেনার মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর ও অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন, খেলাধুলা ও বিনোদন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

কিন্তু এসব প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রত্যাশিত আয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের ১৪ আগস্ট ২০২৫-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের বার্ষিক প্রতিবেদনে বড় প্রকল্পগুলোর হিসাবি মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ব্যয় বৃদ্ধি, বিলম্ব এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

২০২৬ সালের জুনে সেমাফোরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিওমের কিছু চুক্তি বাতিল ও প্রকল্প পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়েও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উন্নয়নের উচ্চাভিলাষ বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে সৌদি আরবের বাজেট ও চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তেলনির্ভরতা আরও কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

এমবিএসের নেতৃত্বের সামগ্রিক মূল্যায়ন

এমবিএসের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তিনি সৌদি আরবের প্রচলিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে পরিবর্তনের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। যে দেশে কয়েক দশক ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতি, সীমিত বিনোদনব্যবস্থা এবং কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে পর্যটন, নারী কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নতুন পরিসর তৈরি হয়েছে।

তবে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের সঙ্গে রাজনৈতিক উদারীকরণ ও আইনের শাসনের সমান অগ্রগতি ঘটেনি। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে দ্রুততা থাকলেও ক্ষমতার জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের পরিবর্তনকে শুধু এমবিএসের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখা উচিত নয়। দেশটির বিপুল তেলসম্পদ, দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তরুণ জনগোষ্ঠী, সরকারি বিনিয়োগ তহবিল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বও এই রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আধুনিক সৌদি আরবের নির্মাতা, নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক উন্নয়নের স্থপতি?

এমবিএস একই সঙ্গে সংস্কারক ও বিতর্কিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসক। তার ইতিবাচক উদ্যোগ সৌদি আরবকে নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক সামরিক নীতির প্রশ্ন তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

তার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সৌদি আরব তেলনির্ভরতা কতটা কমাতে পারে, বেসরকারি অর্থনীতিকে কতটা স্বনির্ভর করতে পারে, নারীর ক্ষমতায়নকে কতটা আইনি ও সামাজিক সমতায় রূপ দিতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহির কতটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার ওপর।

প্রশ্ন হলো, এমবিএস কি এমন একটি আধুনিক সৌদি আরব গড়ে তুলতে পারবেন, যেখানে শুধু অবকাঠামো, বিনোদন ও অর্থনীতি নয়, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিও সমানভাবে বিকশিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।

মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল দেখে যে বার্তা দিলেন মুজতবা খামেনি

যুদ্ধের বিরুদ্ধে ‘না’ ভোট দিয়েছে মার্কিন জনগণ: ইরানের স্পিকার

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নেতা হাসান সালামেহকে ৯ বার গুলি

সৌদি সীমান্তে হুথিদের একের পর এক স্থল অভিযান

মসজিদুল হারামের উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ, ধর্মীয় সেবার গুণগত মান বাড়ছে

ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ড্রোন ভূপাতিতের দাবি আইআরজিসির

হরমুজে মাইন বিস্ফোরণে তিন তেলবাহী ট্যাংকার বিধ্বস্তের দাবি আইআরজিসির

মসজিদে নববীর স্বয়ংক্রিয় ছাতায় প্রযুক্তি ও নান্দনিকতার অনন্য সমন্বয়

বেলফোর ঘোষণা থেকে নাকবা: ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সশস্ত্র তৎপরতা কতটা জানত ব্রিটেন

ইসরাইলি বাহিনীর পাহারায় আল-আকসায় বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশ