সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার চার বছরের যুদ্ধবিরতি এখন চরম ঝুঁকিতে।
গতকাল সোমবার উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে।
এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। গত কয়েক মাস ধরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ চললেও ইয়েমেন এত দিন এর বাইরে ছিল।
হুথিদের অভিযোগ, সোমবার সৌদি আরব ইয়েমেনের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করেছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার ওই বিমানবন্দরে ইরানের একটি বিমান অবতরণ ঠেকাতে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সৌদি সরকার হুথিদের এই অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
সৌদি সামরিক জোট জানিয়েছে, এই বোমাবর্ষণের পর হুথিরা সৌদির দিকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী সেই হুমকি মোকাবিলা করেছে বলে জোটের বিবৃতিতে জানানো হয়।
হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাদের বাহিনী সৌদির আবহা বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তিনি বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদির আকাশসীমা এড়িয়ে চলার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
ইয়েমেনে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বড় ধরনের উত্তেজনা এড়াতে তিনি উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উত্তেজনা কমাতে এবং এমন যেকোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি যা ইয়েমেনে নতুন করে সহিংসতার চক্র তৈরি করতে পারে।’
পটভূমি ও উত্তেজনার কারণ
প্রায় এক দশক ধরে হুথিদের সাথে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভয়াবহ যুদ্ধ চলার পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভঙ্গুর শান্তি দিন দিন আরো স্থায়ী রূপ নিচ্ছিল। চলতি বছর ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের উত্তেজনাও শুরুতে এই শান্তি নষ্ট করতে পারেনি। হুথিরা ইসরাইলে কয়েকটি হামলা চালালেও সৌদির ওপর কোনো হামলা করেনি।
কিন্তু গত ৩ জুলাই সানার বিমানবন্দরে ইরানের একটি বিমান অবতরণের পর থেকে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার এবং হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজায় যোগ দেওয়ার আগে ওই বিমানটি ইয়েমেনে আসে।
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি তখন অভিযোগ করেছিলেন, সৌদির যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের আকাশসীমায় ঢুকে বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে চেয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, ওটি একটি বেসামরিক বিমান ছিল, যা তেহরান থেকে ইয়েমেনি রোগীদের ফিরিয়ে এনেছিল। পরে বিমানটি একটি বড় হুথি প্রতিনিধি দলকে নিয়ে খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে যায়।
ইরানি বিমানের অবতরণে সৌদির আপত্তির কারণ স্পষ্ট নয়। তবে অতীতে ইরান হুথিদের অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনের আকাশে অবরোধ দিয়ে রেখেছে এবং বিমান চলাচল সীমিত রেখেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইয়েমেনের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে সৌদির বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হবে।
তিনি ঘোষণা দেন, যেকোনো পরিণতির বিনিময়ে সানা ও তেহরানের মধ্যে বিমান চলাচল বজায় থাকবে।
এরপর ৪ জুলাই ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার এক বিবৃতিতে বলে, সানায় ইরানের সরাসরি বিমান পরিচালনা ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। একই দিন সৌদি জোট হুথিদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে, তারা ইয়েমেনি জনগণের ওপর নিজেদের গুরুতর অপরাধ থেকে নজর ঘোরাতে এসব কথা বলছে। জোটটি ইরানের বিমানের কথা উল্লেখ না করলেও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের যেকোনো চেষ্টার কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
সোমবারের হামলা ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই সব উত্তেজনা সোমবার সানা বিমানবন্দরে হামলার মাধ্যমে চরম রূপ নেয়। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
তারা জানিয়েছে, ইরানের আরেকটি বিমানের অবতরণ ঠেকাতে তারা এই হামলা চালিয়েছে। তবে ইয়েমেন সরকারের নিজস্ব কোনো কার্যকর বিমানবাহিনী নেই, তারা সামরিকভাবে সৌদির ওপর নির্ভরশীল।
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এই হামলার জন্য সরাসরি সৌদি আরবকে দায়ী করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন, এর মাধ্যমে সৌদি ও হুথিদের মধ্যকার ‘উত্তেজনা প্রশমন পর্বের’ অবসান ঘটল।
পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তাদের একটি বিমান কোনো বিবরণ ছাড়াই লোহিত সাগরের কাছে ইয়েমেনের হোদেইদাহ বিমানবন্দরে সফলভাবে অবতরণ করেছে।
ইয়েমেন সংকটের ইতিহাস
২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তখন হুথিরা সানায় ঢুকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সরকারি কর্মকর্তারা দক্ষিণের শহর এডেনে পালিয়ে যান। ২০১৫ সালে সেই সরকারকে পুনর্বহাল করতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বোমাবর্ষণ শুরু করে।
সেই অভিযান হুথিদের সরাতে ব্যর্থ হয় এবং একপর্যায়ে সৌদি আরব ইয়েমেন থেকে সেনা গুটিয়ে নেয়। হুথিরা এখন দেশের উত্তরাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো মজবুত করেছে, যা ইয়েমেনকে কার্যত দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এডেনভিত্তিক হলেও তাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা মূলত সৌদি আরবে থাকেন। তারা রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে সৌদির ওপর নির্ভরশীল। এই লড়াইয়ের কারণে চরম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হোদেইদাহ প্রদেশে ইয়েমেন সরকার ও হুথি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে স্থল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা পুনরায় যুদ্ধ ডেকে আনার হুমকি দিচ্ছে।
হুথির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম সোমবার সানা বিমানবন্দরের হামলাকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির বড় ধরনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম চালু করার সমাধানগুলো ঝুলিয়ে রাখছে ও প্রত্যাখ্যান করছে। অবরোধের কারণে যুদ্ধের দীর্ঘ সময় এই বিমানবন্দর বন্ধ ছিল।
জাতিসংঘের দূত গ্রুন্ডবার্গ বলেন, এই সংবেদনশীল মুহূর্তে পরিস্থিতি আর যেন খারাপ না হয়, তা প্রতিরোধ করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘সংঘাত বাড়ানোর যেকোনো পদক্ষেপ ইয়েমেনের মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়াবে এবং তাদের শান্তি নষ্ট করবে।’
এএম