যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান স্থাপনায় তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে ইরান। যুদ্ধের তীব্রতা যত বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশগুলোয় ততই বাড়ছে পানি নিয়ে শঙ্কা। কারণ চলতি মাসের শুরুতেই ইরানের ড্রোন হামলায় বাহরাইনের লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এর পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘পানি নিরাপত্তা’ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। এসব দেশে তেল ও গ্যাস হয়তো অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান পানি।
এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশই দৈনন্দিন কাজের জন্য লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা নতুন নয়, এটি বাস্তবতা। কারণ যেকোনো ধরনের বিঘ্নের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ফেলতে পারে।
মুডিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতাকে এখন ভিন্নভাবে দেখা উচিত। প্রতিবেদনে একে ‘একটি গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণের অন্যতম এবং একমাত্র মাধ্যম পরিশোধন। এর কোনো বিকল্প নেই। এটিই খাবার পানির প্রধান উৎস। মুডিস তার প্রতিবেদনে বলেছে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো তাদের বেশিরভাগ খাবার পানির জন্য লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের পরিশোধিত পানির একটি বড় অংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। আর তাদের শত শত প্লান্টের অবস্থানও উপকূল বরাবর। তাই বড় পরিসরে তাৎক্ষণিক বিকল্প খুবই সীমিত তাদের জন্য।
বেশ কয়েকটি দেশে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণের পরই সেখানকার বাসিন্দারা তা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে পারেন। কুয়েত তার প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির জন্য এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সৌদি আরব এবং ওমানও একই প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এ প্লান্টগুলো সাধারণত উপকূলীয় শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্প কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি অবস্থিত। ব্যবস্থাটি কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করলেও একটি সুস্পষ্ট দুর্বলতা তৈরি করে। মুডিস বলছে, এসব দেশের পানি বিশুদ্ধকরণের বড় একটি অংশ উপকূলীয় প্লান্টগুলোয় কেন্দ্রীভূত এবং স্বল্পমেয়াদে বড় পরিসরে এর বিকল্প খুবই সীমিত।
সাম্প্রতিক সংঘাত এ ঝুঁকি আরো প্রকট ও দৃশ্যমান করে তুলেছে। বাহরাইনে হামলা এ ব্যবস্থাকে যে কতটা অরক্ষিত করে তুলেছে, তা এখন স্পষ্ট। এ ঝুঁকিগুলো এখন আর কাগজে-কলমে নেই। আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পানি শোধনাগার এখন সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিশোধন অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ অঞ্চলের সরকারপ্রধানরাও সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে পানি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হতে পারে।
অনেক দেশে মাত্র এক সপ্তাহের বিশুদ্ধ পানি মজুত আছে। তাই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দৈনিন্দিন কাজ, হাসপাতাল এবং শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঝুঁকি শুধু পানি সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এ ব্যবস্থাগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়া চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন, অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কারখানাগুলো চালু রাখার জন্য পানির প্রয়োজন।
মুডিস তার প্রতিবেদনে বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছে, পানির উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বিদ্যুতের আর পরিষেবা, শিল্প এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন পানির। এটি একটি ধারাবারিক প্রক্রিয়া। যদি পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্নিত হবে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদনের গতি কমবে। দৈনন্দিন জীবন এবং জনসেবার জন্য পানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এজন্য সরকারকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। মুডিস বলছে, পানির ধারাবাহিকতার ওপর যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সরকারকেই কার্যকর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। যদিও এ পদক্ষেপ ব্যয়বহুল।
তবে এ অঞ্চলের সব দেশ যে একই ভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে, বিষয়টি তা নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী। ফলে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা অনেক বেশি সক্ষম। তবে অন্যেদের ঝুঁকি বেশি। মুডিস বলছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে বাহরাইনের মতো ‘অত্যন্ত’ দুর্বল অর্থনীতির দেশ আরো বেশি নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সময় একটি বড় বিষয়। কারণ যেকোনো দেশের হাতেই মাত্র অল্প কয়েক দিনের পানি মজুত আছে। তাই পানি শোধনাগার অবকাঠামো ও ব্যবস্থার প্রতি সরকারগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ঘাটতি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এ অঞ্চলের মানুষের জন্য পানি সরবরাহ এখন অন্যতম জরুরি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।