মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত সময়টুকু আধুনিক উপসাগরীয় দেশগুলোর ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগের সময় হিসেবে লেখা থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই হুঁশিয়ারি—‘আজ রাতে একটি সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবে’। এরপর কুয়েত থেকে আবুধাবি পর্যন্ত মানুষের ঘুম ভেঙেছে বিমান বিধ্বংসী সাইরেনের শব্দে।
আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি আর মাঝপথে সেগুলো ধ্বংস করার বিকট শব্দে থমকে গিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিক জীবন। দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি এলেও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যুদ্ধ কি শেষ হলো, নাকি কেবল কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জন্য এই যুদ্ধ কি সেই 'ওয়ার্স্ট কেস সিনারিও' বা চরম বিপর্যয়ের বাস্তব রূপ?
দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো ছিল কেবল আলোচনার টেবিলে বা তাত্ত্বিক। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ সেই সব আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ পানিপথ, যা দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, তা যে কতটা নাজুক তা এখন স্পষ্ট। ইরান প্রমাণ করে দিয়েছে তারা চাইলেই বিশ্বের এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ধমনীকে যেকোনো সময় পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে।
এক সময় সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত ছয় সপ্তাহে কুয়েত থেকে ওমান পর্যন্ত কয়েক ডজন ‘আরামকো স্টাইল’ হামলা হয়েছে। তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর, এমনকি ডেটা সেন্টারগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
দুবাইয়ের পর্যটন শিল্প বা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের যে পরিকল্পনা, তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কবার্তার মধ্যে পর্যটকদের সৈকতে টানানো এখন প্রায় অসম্ভব।
শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা হাব বানানোর স্বপ্নও ধাক্কা খেয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যের বদলে আয়ারল্যান্ড বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোকে নিরাপদ মনে করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হলো উচ্চপদস্থ দক্ষ বিদেশি পেশাজীবী। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেক প্রবাসী এখন তল্পিতল্পা গোছাতে শুরু করেছেন। প্রবাসীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে এখন ‘এক্সিট সেল’ বা আসবাবপত্র বিক্রির হিড়িক। যদি এই প্রবণতা বাড়ে, তবে আবাসন খাত ও স্থানীয় ব্যবসায় ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি অলিখিত চুক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি গাড়তে দেওয়া এবং বিনিময়ে সুরক্ষা পাওয়া। কিন্তু এবারের যুদ্ধ দেখিয়েছে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হলেও এই সম্পর্কের কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সৌদি আরব বা বাহরাইনের মতো দেশগুলো এখন ইউক্রেন বা ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব খুঁজছে।
সূত্র : রয়টার্স