বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রসহ উপসাগরীয় দেশগুলো
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। তবে এবার সেই প্রণালিকে ঘিরে নতুন এক কৌশলগত ইস্যু সামনে আনছে ইরান। দেশটির গণমাধ্যম ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহল এখন হরমুজ প্রণালির পানির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ডেটা ক্যাবলসকে ভবিষ্যৎ চাপ প্রয়োগের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে।
সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক যখন আরো জটিল হয়ে উঠছে, তখনই ইরানের বিভিন্ন মহলে এই আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোর ওপর নজরদারি কিংবা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে তেহরানের হাতে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি গত ৮ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলসকে সম্ভাব্য চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এসব ক্যাবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
টেলিকমিউনিকেশন সেবা প্রদানকারী টাটা কমিউনিকেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যালকন, গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই) এবং টিজিএন-গালফসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে। এসব নেটওয়ার্ক উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপ ও এশিয়ার বৈশ্বিক ডেটা অবকাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
বিশেষ করে টিজিএন-গালফ ক্যাবল ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবকে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। একই সঙ্গে গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর নির্ভরশীলতাও দিন দিন বাড়ছে এই অবকাঠামোর ওপর। আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক এসডব্লিউআইএফটিও এসব ক্যাবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে উল্লেখ করেছে ফার্স নিউজ।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, যদি বিংশ শতাব্দীতে তেল হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, তবে একবিংশ শতাব্দীতে সেই জায়গা নিয়েছে ডেটা।
আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ আরেক সংবাদমাধ্যম মাশরেক নিউজ সমুদ্রতলের এই ক্যাবল নেটওয়ার্ককে ইরানের নীরব অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, এই অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে ইরানের সংসদ সদস্য এহসান ঘাযিযাদেহ হাশেমি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় সাবমেরিন ক্যাবল সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি “অ্যাকশন প্ল্যান” তৈরি করছেন আইনপ্রণেতারা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সমুদ্রতলের কোনো ডেটা ক্যাবল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত বা রুট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইরান সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এমনকি এসব কাজের জন্য সার্ভিস চার্জও আরোপ করা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার মতো বড় বাধার মুখে পড়তে পারে তেহরান। তবুও বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরান এখন শুধু তেল পরিবহন নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অবকাঠামোকেও ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, এইই-ওয়ান, ফ্যালকন এবং গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে।
ফলে ওই অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফার্স নিউজের দাবি, সমুদ্রতলের এই ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। তাই এসব অবকাঠামোয় বিঘ্ন ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; বরং এটি ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এআরবি