হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সৌদিতে হুথিদের হামলা, তবু কেন অস্ত্র ধরছে না মক্কা জোট

আমার দেশ অনলাইন

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভ্যান্টর প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশন। ছবি: এএফপি।

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হলেও তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সদ্য গঠিত প্রতিরক্ষা জোট এখনো কোনো যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। গত মাসে মক্কায় তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে জোটটি বাস্তবে কতটা কার্যকর?

বিশেষজ্ঞদের একাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন থেকেই জানতে চেয়েছেন, হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালালে তুরস্ক ও পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে রিয়াদের সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসবে কি না। সপ্তাহান্তে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের উপকূলের কয়েকটি অংশ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার খবর এবং এরপর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা সেই বিতর্ক আরো জোরালো করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পরিবহনকারী এই পাইপলাইনে হামলা পরিস্থিতির গুরুত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই কেন যৌথ সামরিক অভিযান দেখা গেল না—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘জোট ব্যর্থ হয়েছে’ বলে দেওয়া যায় না। এর সঙ্গে অন্তত তিনটি পৃথক বিষয় জড়িত: প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা আদৌ কার্যকর হয়েছে কি না, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক কাঠামো তৈরি হয়েছে কি না এবং সদস্যদেশগুলো রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সংহতি দেখাচ্ছে কি না।

এখনো কার্যকর হয়নি প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা

মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মক্কা চুক্তিকে ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরার সমালোচনা ‘অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর মাধ্যমে জোটটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তার দাবি, চুক্তির প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এখনো আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি। তিন দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই এসব বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে।

ওই কর্মকর্তা জানান, তুরস্ক শিগগিরই চুক্তিটি দেশটির পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবে। সম্ভাব্যভাবে অক্টোবরে এর পাঠ প্রকাশ করে সংসদীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট কোনো নিরাপত্তা চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন না।

পাকিস্তানকেও চুক্তিটির জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে। তবে সৌদি আরব রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে এটি অনুমোদন করতে পারে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফলে চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই তুরস্ক সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন দাবি আইনগত দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন তিনি।

শুধু চুক্তি নয়, দরকার সামরিক প্রস্তুতিও

তুর্কি কর্মকর্তার মতে, মক্কা চুক্তি কেবল একটি নিরাপত্তা সমঝোতা নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ।

তিনি বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পরও তিন দেশকে হুমকি মূল্যায়ন, পারস্পরিক পরামর্শ এবং সামরিক সহায়তার পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হবে প্রতিরক্ষা ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা, বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সক্ষমতা বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা।

তিন দেশ এরই মধ্যে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের মেয়াদে একজন পাকিস্তানি মহাসচিব এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন।

এ ছাড়া সামরিক সক্ষমতা ও সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও দেশগুলো সম্মত হয়েছে।

তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, মহাসচিব নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রতিরক্ষা আলোচনা আয়োজনের সিদ্ধান্ত জোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথে অগ্রগতির প্রমাণ। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে ‘কয়েক বছর’ সময় লাগতে পারে।

ন্যাটোর মতো হলেও ‘স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ’ নয়

মক্কা চুক্তিতে একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতি থাকায় এর সঙ্গে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের তুলনা করা হচ্ছে। তুর্কি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির খসড়া তৈরির সময় ন্যাটো চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

তবে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পাল্টা হামলার নির্দেশ দেয় না। কোনো মিত্রদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা সহায়তা করতে বাধ্য হলেও কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা প্রত্যেক দেশ নিজেই নির্ধারণ করে। সেই সহায়তা সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ না-ও হতে পারে।

মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা জানিয়েছেন ওই তুর্কি কর্মকর্তা। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইবে, এরপর সদস্যদেশগুলো বৈঠকে বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ, সৌদি আরবে হুতিদের একটি হামলা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুরস্ক বা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পাল্টা হামলায় যাবে—চুক্তির অর্থ এমন নয়।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমর্থন

সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয় দেশই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তান আরো জানিয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো অনুরোধ জানায়নি।

তুর্কি কর্মকর্তা ন্যাটোর অভিজ্ঞতার উদাহরণও টেনেছেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে তুরস্ক রুশ একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে দাবি করেছিল যে বিমানটি তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এরপর আঙ্কারা ন্যাটোর জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছিল। ন্যাটো তুরস্কের বিমান প্রতিরক্ষা জোরদারসহ অতিরিক্ত আকাশ ও নৌ সক্ষমতা মোতায়েনের মাধ্যমে সমর্থন দিয়েছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোর আকাশসীমায় রুশ ড্রোনের একাধিক অনুপ্রবেশের ঘটনায়ও প্রতিবার সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।

লক্ষ্য তাৎক্ষণিক যুদ্ধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ

তুর্কি কর্মকর্তার মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য কোনো একটি চলমান সংঘাতে তাৎক্ষণিক সামরিক সমাধান দেওয়া নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে তিন দেশের মধ্যে এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হামলার আগে একাধিকবার চিন্তা করতে বাধ্য হয়।

তিনি স্বীকার করেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সম্ভাবনা কিংবা সৌদি আরবে হুথিদের হামলার মতো পরিস্থিতিই নতুন জোটটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। তবে তার ভাষ্য, এসব পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করাই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য।

অতএব, সৌদি আরবে হুতি হামলার পর তুরস্ক-পাকিস্তানের যৌথ সামরিক অভিযান না হওয়াকে এককভাবে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। চুক্তিটির আইনগত অনুমোদন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সামরিক সমন্বয় এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা—সবকিছু পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে এখনও সময় প্রয়োজন।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

হরমুজ অবরোধে গভীর সংকটে আরব দেশগুলোর অর্থনীতি

ইয়েমেনে এক সপ্তাহে হতাহত প্রায় ৩ হাজার: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

অ্যানিমেটেড মানচিত্রে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বসতি বিস্তারের চিত্র

পবিত্র কাবায় বৃষ্টিতে ভিজে নামাজ আদায় মুসল্লিদের

আরো কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিলেন হুথি বিদ্রোহীরা

গাজার শিক্ষাব্যবস্থা ইউনেস্কোর কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা নেই: জাতিসংঘ

গাজার যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি পুরুষদের জীবন

সৌদিতে ক্যামেল ফেস্টিভালে ১৩১ মিলিয়ন ডলারের ১১৪ উট

জ্বালানি সরবরাহ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনছে সিরিয়া

উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান সৌদি-আমিরাতের