ইরানের ২০০ রাতের সমাবেশে জনগণের উপস্থিতি জাতীয় সংহতি ও দৃঢ়তার প্রকাশ। সমাবেশগুলোকে ইরানের জনগণের প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে রাতব্যাপী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্প প্রকাশ করছেন।
ইরানের জনগণের টানা ২০০ রাতের সংহতি সমাবেশের প্রশংসা করেছেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। তিনি বলেছেন, জনগণের এই উপস্থিতি ইরানের বিশ্বাস, সংহতি ও জাতীয় দৃঢ়তার এক স্থায়ী প্রতিচ্ছবি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ শক্তির বহিঃপ্রকাশ। তার বক্তব্যে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি জনগণের ঐক্য ও জাতীয় সংকল্পকে ইরানের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই একই সঙ্গে সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রকাশ।
সম্প্রতি এক বার্তায় হাতামি বলেন, টানা ২০০ রাত ধরে জনগণের উপস্থিতি তাদের বিশ্বাস, ঐক্য ও জাতীয় সংকল্পের স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধের দাবি, সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থনের মধ্য দিয়ে এই সমাবেশগুলো জনগণ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করেছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও যে জাতি ঐক্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে মাঠে থাকে, তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে শত্রুদের পরিকল্পনা সফল হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের সেনাপ্রধানের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, জাতীয় নিরাপত্তাকে তিনি শুধু অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বিষয় হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, সামরিক শক্তির কার্যকারিতা জনগণের বিশ্বাস, ঐক্য ও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই ধারণা ইরানের সরকারি রাজনৈতিক বয়ানে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তবে হাতামির বক্তব্যটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যায়ন; জনগণের ঐক্য বা রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনের ব্যাপকতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো পরিমাপ এতে দেওয়া হয়নি।
তবে ইরানের রাতব্যাপী সমাবেশগুলোকে শুধু জাতীয় ঐক্যের প্রকাশ হিসেবে দেখলে পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ধরা পড়ে না। ২০০ রাতের এই সমাবেশগুলো ক্রমে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। কিছু সমাবেশে পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এতে সমাবেশগুলোর চরিত্র ও উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের ভেতরেই আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সমাবেশগুলোকে ঘিরে কিছু নাগরিক যানজট, উচ্চ শব্দ ও দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্নের অভিযোগ করেছেন। দেশটির কয়েকটি সংবাদপত্রও সমাবেশগুলোর সংগঠন, রাজনৈতিক স্লোগান এবং সামাজিক বিভাজন তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সমাবেশকে সরকারি মহল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে জনগণের সমর্থনকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তি বা জনসমাবেশের ওপর নির্ভর করে না। অর্থনীতি, কূটনীতি, সামাজিক সংহতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং জনগণের আস্থাও জাতীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই হাতামির বক্তব্যকে ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-চিন্তার একটি প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়; এটি ইরানের সামগ্রিক শক্তির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের ঐক্যকে জাতীয় শক্তির একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি দেশের জনগণ যখন বহিরাগত চাপ বা নিরাপত্তা সংকটের সময় রাষ্ট্রের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে, তখন তা সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান ও প্রতিরক্ষা নীতিকে রাজনৈতিক সমর্থন দিতে পারে। তবে সেই সমর্থনের প্রকৃতি, স্থায়িত্ব ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য জনমত জরিপ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মতামত প্রয়োজন।
ইরানের সেনাপ্রধান তার বার্তায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় কাজ করে যাবে। এই বক্তব্যে সামরিক বাহিনী ও জনগণের সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আমির হাতামির বক্তব্য ইরানের জাতীয় শক্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের একটি সুস্পষ্ট ধারণা প্রকাশ করেছে। তার মতে, সামরিক প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতার পাশাপাশি জনগণের বিশ্বাস, ঐক্য ও দৃঢ় সংকল্প ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি। এই বক্তব্য ইরানের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ককে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সূত্র: ডন, ইরনা, পার্সটুডে, প্রেসটিভি ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল