হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও লড়ে যাচ্ছে অদম্য ইরান

ইসরাইল-আমেরিকার আগ্রাসনের এক মাস

মাসুম বিল্লাহ

ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের এক মাস পার হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানে হামলা চালায়। একই দিন ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান। যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং যারা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমালোচক; তারাও শত্রুদের হাত থেকে দেশ রক্ষায় সরকারকে সহযোগিতা করছে। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সমানতালে লড়ে যাচ্ছে ইরান। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আইয়ের।

অন্যদিকে যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান তার সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে আসছে। ইসরাইলে হামলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। যা এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর সক্ষমতা কমিয়েছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।

এমন অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। গত কয়েকদিন থেকে তিনি বারবার বলছেন- ইরান চুক্তি করে যুদ্ধ থেকে নিজেদের বাঁচাতে চায়; তবে ইরান এ বক্তব্য অস্বীকার করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত মোট প্রাণহানি

যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যার বেশিরভাগ ইরান এবং লেবাননের নাগরিক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর গতকাল পর্যন্ত ইরানে নিহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৯৩৭ জন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো প্রায় ২৫ হাজার। লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন এক হাজার ১১৬ জন। এসব হামলায় আহত হয়েছেন আরো প্রায় ৩২০০ এর বেশি মানুষ। ইসরাইলে মারা গেছে ১৯ জন এবং আহত হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। অন্যদিকে মার্কিন ১৩ সেনা নিহতের পাশাপাশি ২০০ আহত হয়েছে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইরাকে ৯৬ জন, সংযুক্ত আরব অমিরাতে ১১ জন, ওমানে তিনজন, সৌদি আরবে দুজন, ফিলিস্তিনে চারজন, সিরিয়ায় চারজন এবং কুয়েতে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কাতার-জর্ডানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছে।

কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখায় যুদ্ধে কৌশলগতভাবে ইরান এগিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমআই সিক্স-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়াঙ্গার দ্যা ইকোনমিক্সকে দেওয়া পডকাস্টে বলেছেন, যুদ্ধে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির জটিলতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, বাস্তবে ইরানের সরকার যতটা দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। তারা গত বছরের জুন থেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—বিশেষ করে তাদের সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা বিভিন্ন পর্যায়ে অর্পণ করা। ফলে শক্তিশালী বিমান হামলার মুখেও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক এ গোয়েন্দা প্রধান আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য ইরানের কাছে এ বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, তারা এক ধরনের সভ্যতাগত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে—যা তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করায় ইরানকে তাদের মার্কিন প্রতিপক্ষের তুলনায় বেশি স্থায়িত্ব ও সহনশীলতা অর্জনে সহায়তা করেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। যা ইরানকে যুদ্ধে আমেরিকার থেকে এগিয়ে রেখেছে।

২৫০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী হারাল ইরান

ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ২৫০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হোসেন সাদেগির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। হোসেন সাদেগি জানিয়েছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত দেশটির ৭২৩টি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানজুড়ে ৬০০টিরও বেশি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধে ইরানের অবকাঠামোগত ও আর্থিক ক্ষতি

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশজুড়ে ৯২ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ৯২ হাজার ৬৬২টি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে ৭১ হাজার ৩৫৬টি আবাসিক ইউনিট, ২০ হাজার ৩৯৯টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ২৯০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ৬০০টি স্কুল।

সংস্থাটি আরো জানায়, এই যুদ্ধে তাদের ১৭টি রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্র, ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্স এবং তিনটি ত্রাণবাহী হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এর কমান্ডার ব্রাড দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইরানের ১০ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোর ৯২ শতাংশ ধ্বংসের দাবিও করেছেন তিনি।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করল ইরান

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, এ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করলে জাহাজগুলোকে কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে। শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ খবর জানিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘ইসরাইল-আমেরিকার মিত্র ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কোনো জাহাজ হরমুজের কোনো করিডোর ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে না। এ ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী অন্তত তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজ দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। বিবিসির এক বিশেষ বিশ্লেষণ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) যৌথ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। তবে পেন্টাগন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে আরো ১০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে আমেরিকা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পথ খোঁজার পাশাপাশি ট্রাম্প সামরিক বিকল্প রাখতেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিশাল সৈন্য বহর পাঠানোর মূল লক্ষ্য হলো তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করা।

ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা আরো ১০ দিন স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের

আগামী ১০ দিনের জন্য ইরানের জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা খুবই ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। তবে যুদ্ধ থামাতে আমেরিকার দেওয়া প্রস্তাবকে ‘একতরফা ও অন্যায্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের এক কর্মকর্তা। হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ট্রুথ সোশ্যালে হামলা স্থগিতে সিদ্ধান্তের কথা জানান ট্রাম্প।

নিজের পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ইরান সরকারের অনুরোধ মেনে দেশটির জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার প্রক্রিয়া ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখছি। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ জারি থাকবে বলেও জানান তিনি।

ইরানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া : জার্মানি

ইরানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে রাশিয়া সাহায্য করছে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডিপুল। তিনি অভিযোগ করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে রুশ হামলা থেকে বিশ্বের নজর সরাতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে ব্যবহার করতে চাইছেন। ফ্রান্সে জি-৭ বৈঠকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভাডিপুল বলেন, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে আলাপকালে জার্মানির অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন।

এদিকে গতকাল শুক্রবারও ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইল। ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরান। এদিন ইরানের কোম শহরে হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইরান ও হিজবুল্লার হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলে ২৬১ জন আহত হয়েছেন।

ইসরাইলের যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

সৌদির প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, আহত ১০ মার্কিন সেনা

জয়ের দাবি থেকে সরে এসে ট্রাম্প বললেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি

ইরানের বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, উদ্বেগে আইএএইএ

ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা, তেল আবিবে নিহত ১

‘ট্রিগারে আঙুল’, সরাসরি যুদ্ধে নামার হুঁশিয়ারি হুথিদের

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় ইরানের দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস, নিহত ২৫ শ্রমিক

পরমাণু স্থাপনায় হামলার জন্য ইসরাইলকে ‘কঠিন মূল্য’ দিতে হবে

ইরানের আবাসিক এলাকায় হামলা, নারী-শিশুসহ নিহত ১৩

মার্কিন-ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সতর্ক করল ইরান