ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে লাভের আশায় ঋণ করে গরু কিনেছিলেন দুই বেপারি। স্বপ্ন ছিল কোরবানির হাটে গরু বিক্রি করে সংসারে স্বস্তি ফেরাবেন, ঋণের টাকা শোধ করবেন। কিন্তু এক মুহূর্তেই সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
গোপালগঞ্জ-কোটালীপাড়া সড়কের কাজুলিয়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খালে পড়ে পানিতে ভেসে উঠে চারটি গরুর নিথর দেহ। আর সেই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন গরুর বেপারিরা। ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৫টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা ও কোটালীপাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী কাজুলিয়া এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলার শিয়ালমারি গরুর হাট থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে আটটি গরু কিনে বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার বাওলিয়া গরুর হাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন উজিরপুর উপজেলার কাউয়ারেখা গ্রামের মৃত দুলাল বেপারির ছেলে রানা বেপারি ও মশাং গ্রামের সামসুল হকের ছেলে লিটন বেপারি। তাদের সঙ্গে ছিলেন লিটন বেপারির ছেলে সৈকত বেপারিও।
ভোরে কাজুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে গরুবাহী ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খালে পড়ে যায়। মুহূর্তেই ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে পানিতে আটকে যায় কয়েকটি গরু। পরে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে চারটি গরুকে জীবিত উদ্ধার করলেও চারটি গরু পানিতে মারা যায়।
দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক নজরুল পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।
খালের পানিতে একে একে গরুগুলোর মৃতদেহ ভেসে উঠতে দেখে ঘটনাস্থলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বেপারিরা। চারদিকে তখন শুধুই আহাজারি আর হতাশার দীর্ঘশ্বাস।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রানা বেপারি বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে সুদে টাকা আর ধার করে গরুগুলো কিনছিলাম। আশা ছিল ঈদের হাটে বিক্রি করে কিছু লাভ হবে। সংসারটা একটু ভালো চলবে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব জানি না। গরুগুলা আমার সব ছিল।’
পাশেই দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন লিটন বেপারি। তিনি বলেন,
“সারা রাত জেগে গরুগুলা নিয়ে আসছি। আর একটু হলেই হাটে পৌঁছে যেতাম। আল্লাহ আমাদের জীবন বাঁচাইছে, কিন্তু গরুগুলা আর বাঁচল না। এত বড় ক্ষতি কীভাবে সামলাব বুঝতে পারতেছি না।’
উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় মুসল্লি আব্দুল কাদের শেখ বলেন,
‘ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে যাই। গিয়ে দেখি ট্রাক খালে উল্টে আছে, গরুগুলো পানির মধ্যে ছটফট করছে। আমরা কয়েকজন মিলে গরুগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করি। কিন্তু চারটা গরু ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। বেপারিদের কান্না দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’
কোটালীপাড়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ইনচার্জ মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চালক ঘুমের ঘোরে থাকায় ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করি। ট্রাকের নিচ থেকে চারটি গরুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’
স্থানীয়দের দাবি, ঈদ সামনে রেখে হাজারো গরু ব্যবসায়ী ঋণ করে গরু কিনে দেশের বিভিন্ন হাটে নিয়ে যান। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তাদের স্বপ্ন, পুঁজি ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে পারে। কাজুলিয়ার এই দুর্ঘটনাও তেমনই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে রইলো।
এমএইচ