পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর
পটুয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে ৩৬ কোটি টাকার ওভারহেড ট্যাংকের কাজ ভাগবাঁটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া টেন্ডার ড্রপিংয়ে বাধা ও সরকার নির্ধারিত ১০ শতাংশ কমে কাজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা না মেনে বরং অতিরিক্ত ৯ শতাংশ যোগ করে মোট ১৯ শতাংশ টাকা বেশি দেখিয়ে টেন্ডার দাখিল করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ছয় কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
জানা গেছে, আশরাফুজ্জামান উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন দলের নেতা ও স্বজনদের কাজ পেতে সহায়তা করেছেন। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে নির্বাহী প্রকোশলীসহ অফিসের অন্যদের পকেটে গেছে কমপক্ষে দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এসব কাজের জন্য ঢাকাসহ পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জান ও অন্যরা নির্দিষ্ট হারে ঘুস পাবেন বলে তাদের মোবাইল ফোনের কথোপকথনে উঠে এসেছে, যা এ প্রতিবেদকের হাতে আছে।
তার এ অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দুই ঠিকাদার। এ নিয়ে নিবন্ধিত ঠিকাদারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সূত্র জানায়, পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামানের অধীন গত বছরের অক্টোবরে ১২টি প্যাকেজে তিন কোটি টাকা করে মোট ৩৬ কোটি টাকার ওভারহেড ট্যাংকের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। গত ৬ অক্টোবর ছিল কাজ বণ্টনের টেন্ডার ক্লোজিংয়ের শেষ সময়। কিন্তু ওই দিন পূর্বনির্ধারিত টেন্ডার ক্লোজিং না করে নিজ ক্ষমতাবলে পাঁচদিন সময় বাড়িয়ে ১২ অক্টোবর শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করেন তিনি। বর্ধিত সময়ের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী স্থানীয় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাজ পেতে সহায়তা করেন। এজন্য ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচের বিনিময়ে আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া তিনি টেন্ডার ফরম ক্রয় এবং ঠিকদারদের অংশগ্রহণ না করতে হুমকি ও টেন্ডার ড্রপিংয়ে বাধা দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে তাদের নির্ধারিত ঠিকাদার ছাড়া টেন্ডার ফরম ক্রয় করা অন্য ঠিকাদাররা টেন্ডার ফরম ও পে-অর্ডার কেটেও তা দাখিল করতে পারেননি। তবে অংশগ্রহণ করা ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগসাজশে ধার্য করা টাকার চেয়ে অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ বেশি দেখিয়ে টেন্ডার দাখিল করে কাজ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিষয়টি তুলে ধরে মেসার্স আল মদিনা মটরর্সের স্বত্বাধিকারী মোশারেফ হোসেন এবং এমএস সাফা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফারুক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক বরাবর একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনপত্রে তারা উল্লেখ করেন, গত ১২ অক্টোবর একাধিক লাইসেন্সধারী শিডিউল ক্রয় করে যথানিয়মে পে-অর্ডার কাটেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তি অফিসের সহায়তায় টেন্ডার ড্রপ না করার জন্য তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং কাজগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেন। অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ায় টেন্ডারটি বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পেতে সহায়তা করারও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আয়ান ট্রেডার্স দুটি, এসআর লিমিটেড দুটি, জিলানি ট্রেডার্স একটি, মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজ দুটি এবং মেসার্স শহিদুল ইসলামকে দুটি। বাকি কাজ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে মেসার্স আল মদিনা মটরর্সের মালিক মোশারেফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা টেন্ডার ফরম ক্রয় করি ও পে-অর্ডার জমা দেই। আমাদের টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেওয়ায় অন্য ঠিকাদাররাও টেন্ডার জামা দিতে পারেননি। এছাড়া আওয়ামী আমলে গত ১৫ বছরে যেসব লাইসেন্স কাজ পেয়েছে, এখনো তারাই কাজ পায়। এসব লাইসেন্সের মালিক পলাতক থাকলেও বিএনপির ঠিকাদাররা ওই সব লাইসেন্সে কাজ নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ট্রেন্ডারে কোনো অনিয়ম হয়নি। শিডিউল অনুযায়ী অনলাইনের মাধ্যমে টেন্ডার কল করা হয়। অনলাইনে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকায় টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি ৬ পার্সেন্ট ঘুস গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আপনার কাছে প্রমাণ থাকলে লেখেন, কোনো সমস্যা নেই।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হুমাউন কবীর বলেন, ওই কাজটি একটি প্রকল্পের কাজ। টেন্ডার আহ্বান বা কাজ বণ্টনের বিষয়টি তার জানা নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পিডি ভালো বলতে পারবেন। তবে অনিয়মের অভিযোগ পেলে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে তা পাঠিয়ে দেব।
প্রকল্প পরিচালক আবু হানিফ আমার দেশকে বলেন, ইজিপিতে টেন্ডার হয়েছে। এখানে কাউকে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তার কাছে দেওয়া ঠিকাদারদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো কোনো অভিযোগ হাতে পাইনি। টেন্ডার জমা দিতে বাধা, বিএনপি-জামায়াত ও সমন্বয়কদের মধ্যে কাজ বণ্টন, ৬ শতাংশ ঘুস এবং অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ অর্থ অপচয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়েই ফোনের লাইন কেটে দেন।