ভারত সীমান্তে ঢিলেঢালা ভাব
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চোরাপথে দেশে আসা ভারতীয় মসলায় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। গত বছরের তুলনায় এ বছর বৈধপথে মসলার আমদানি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কমেছে ২৫ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত। শুধু এ খাত থেকে রাজস্ব আয় কমেছে ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অথচ গত ১০ বছরের পরিসংখ্যন বলছে, প্রতি বছর মসলা আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হতো ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত, কিন্তু এবারের চিত্র একেবারেই উল্টো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে অনেকটা অলিখিতভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় সীমান্ত আর এ কারণে চোরাই পথে বিপুল পরিমাণ মসলা আসছে দেশের বাজারে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে মসলার দাম কিছুটা সহনীয় থাকলেও একদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, পাশাপাশি অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়ত ও গুদাম ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে । বিশেষ করে কোরবানি ঈদে বেশি চাহিদাসম্পন্ন মসলাগুলোতে সয়লাব হয়ে গেছে বাজার। প্রতিটি পণ্যই পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে আসা। বাজারে পর্যাপ্ত মসলা থাকায় দামও তুলনামূলক কম, তাই ক্রেতারাও খুশি। কিন্তু এখানেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। কারণ মসলার বড় অংশটিই এসেছে ভারত থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে। আর এ কারণে মসলা আমদানির বিপরীতে সরকার নির্ধারিত শুল্ক আদায় হয়নি। যে কারণে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মসলা আমদানিসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে বেরিয়ে আসে রাজস্ব ফাঁকির ভয়াবহ এ চিত্র। কাস্টমস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি হয়। গত বছর যে পরিমাণ মসলার চাহিদা ছিল এ বছর তার চেয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বেশি বিক্রি হওয়ার কথা। গত ১০টি অর্থবছরের মসলা আমদানির চিত্র এমনই। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আমদানি তথ্য বলছে ভিন্নকথা।
কোরবানির ঈদ সাধারণত মে-জুনে হয়ে থাকে। ঈদকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ মসলার চাহিদা বাড়ে দেশের বাজারে। ঈদের এ বাজার ধরতে প্রতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মসলা আমদানি হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এবারের চিত্র আলাদা।
সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন প্রচলিত মসলা পেঁয়াজ। যদিও সবজি জাতীয় এ মসলাটি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয় কম। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ১৬ হাজার ৫১০ টন। এবার বৈধপথে এ পণ্যটি আমদানি হয় মাত্র ৭৪ দশমিক ৫০০ টন। শতাংশের হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজ আমদানি কমেছে ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় চাহিদাসম্পন্ন মসলা রসুন। ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রসুন আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৩৫ হাজার ১৫৮ মেট্রিকটন। এ বছর রসুন এসেছে ৬৯ হাজার ৫৫৯ মেট্রিকটন। শতাংশের হিসাবে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ রসুন কম এসেছে এ বছর।
গত বছর এলাচি আমদানি হয়েছিল এক হাজার ৮৯৩ মেট্রিকটন। এ বছর এখন পর্যন্ত এ মসলাটি এসেছে এক হাজার ৯৮ মেট্রিকটন। শতাংশের হিসাবে এলাচিতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ।
গত বছর তিন হাজার ৯৩৮ মেট্রিকটন জিরা আমদানি হয়েছিল। এবার জিরা এসেছে দুই হাজার ৭৯৩ মেট্রিকটন। শতাংশের হিসাবে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ কম আমদানি হয়েছে।
গত বছর ১২৫ টন শুকনো মরিচ আমদানি হলেও এ বছর এসেছে ৮৬ মেট্রিকটন। শতাংশের হিসাবে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ কম। গত বছর চার হাজার ৭৭৮ মেট্রিকটন হলুদ আমদানি হয়েছিল। এবার ৭৫৩ মেট্রিকটন।
তবে চলতি বছর বৈধপথে আমদানি বেড়েছে শুধু আদা আর দারুচিনি। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ হাজার ৬১১ মেট্রিকটন দারুচিনি আমদানি হলেও এবার আমদানি হয়েছে ১২ হাজার ৫৩৪ মেট্রিকটন। গেল বছর ৩৮ হাজার ৫৪৭ মেট্রিকটন আদা আমদানি হয়েছিল। এ বছর এসেছে ৬২ হাজার ৩৯৪ মেট্রিকটন।
বেশিরভাগ মসলা গেল বছরের চেয়ে অনেক কম আমদানি হলেও খাতুনগঞ্জের প্রতিটি আড়ত মসলায় ভরপুর। রিয়াজ উদ্দিন বাজার, কর্ণফুলী মার্কেটসহ চট্টগ্রামের বড় বড় খুচরা বাজারগুলোতেও পর্যাপ্ত মসলার জোগান আছে। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর কোরবানি ঈদের দুই মাস আগে থেকে বেচাকেনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মসলার দামও বাড়তে শুরু করে। এবারও বেচাকেনা বেড়েছে, কিন্তু দাম বাড়েনি। বরং কিছু কিছু মসলার দাম দিনদিন কমছে।
তিনি জানান, গত সপ্তাহে পাইকারিতে প্রতি কেজি জিরা ৫৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্রি হয়েছে ৫৪০ টাকায় । এক হাজার ৩৪০ টাকার লবঙ্গ সপ্তাহের ব্যবধানে এক হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চার হাজার ১০০ টাকার এলাচ বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৯০০ টাকায়। এক হাজার ৪০ টাকার গোলমরিচ এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৩৭০ টাকার দারুচিনি এখন ৩৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এভাবে প্রতিটি মসলার দাম এখন কমতির দিকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাতুনগঞ্জের বেশ কয়েকজন মসলা ব্যবসায়ী জানান, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ভারতের সীমান্ত পয়েন্টগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত রয়েছে। অবৈধপথে বিপুল পরিমাণ মসলা আসছে বাংলাদেশে।
তারা জানান, চট্টগ্রামে মসলা আসছে ফেনী, কুমিল্লা ও খাগড়াছড়ির কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে। প্রতি রাতেই বিপুল পরিমাণ মসলা আসছে খাতুনগঞ্জে। চোরাই পথে পণ্য আসায় বাজারে চাহিদার চেয়ে বেশি মসলার জোগান রয়েছে। আর এ কারণে অন্যান্য বছর ঈদের আগে সব ধরনের মসলার দাম বাড়লেও এ বছর কমতির দিকে। খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এক কেজি জিরা বৈধভাবে আমদানি করলে সরকারকে রাজস্ব দিতে হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এককেজি এলাচে শুল্ক দিতে হয় এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু যারা চোরাই পথে আনছে তাদের হয়তো বর্ডার খরচ দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে বাজারেও তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
তাদের মতে, বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে রাজস্ব আয় করতে হলে অবিলম্বে বর্ডার সিল করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। নইলে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস মসলাজাতীয় পণ্য। কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রধানত ১২ ক্যাটাগরির মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই ১২ ক্যাটাগরির মসলা মিলে আমদানি হয়েছিল দুই লাখ ১৫ হাজার ৫৪৫ টন। আর চলতি বছর আমদানি হয়েছে এক লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ টন। এ খাত থেকে গেল বছর রাজস্ব এসেছে ৫৫৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ সময়ের মধ্যে এ খাত থেকে রাজস্ব এসেছে ৪৫৭ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে যা ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কম।