কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে পুরোনো কর্মস্থলে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে লাথি দিয়ে চেয়ার থেকে ফেলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা। আহত শিক্ষিকা হাসিনা ইসলাম বর্তমানে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আছেন।
অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম সুজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় মামলা রয়েছে।
রোববার ব্রাহ্মণপাড়ার বেড়াখলা আব্দুল মতিন খসরু বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে এ ঘটনাটি ঘটে। এ সময় আমিনুলের চাচাতো ভাই সিদলাই ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা দলীয় কর্মীদের নিয়ে স্কুলে মব করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সুজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে লাথি মেরেছেন। এ সময় উপজেলার সিদলাই ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানাসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মী বিদ্যালয়ে এসে মব করেন।
জানা যায়, অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম সুজন জাল সনদ দিয়ে দীর্ঘদিন এই বিদ্যালয়ে চাকরি করে আসছিলেন। জাল সনদ ধরা পড়ায় ২০১৯ সালে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। সম্প্রতি সুজন দাবি করেন, আদালত তার পক্ষে রায় দিয়েছে। এমন দাবি করে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি আবারও কর্মস্থলে যোগদান করেন। এরপর থেকেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করেন। পরে গতকাল সকালে এসে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার ওপর হামলা করে আমিনুল ইসলাম সুজন ও সোহেল রানা।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকা হাসিনা ইসলাম বলেন, ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ আমার ওপর হামলা করেছে। আমি সবার চেহারা দেখিনি। কয়েকজনকে চিহ্নিত করতে পারছি। আমার ওপর হামলা করার জন্য প্রথমে হুকুম দিয়েছে চৌধুরী বাড়ির মাহবুব চৌধুরী। তাকে মাসুম নামে সবাই চেনে। এছাড়া বেড়াখলা পশ্চিমপাড়ার ফজলুল হকের ছেলে লুৎফুর রহমান, বিএনপির কর্মী হাজী বাড়ির সোহেল এবং সুরুজ মিয়ার ছেলে সবুজ সিসি ক্যামেরা ভেঙেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা আমাকে চেয়ার থেকে লাথি মেরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দেয়। কোমর ব্যথায় আমি দাঁড়াতে পারছি না। তারা আমার মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে এবং মোবাইলটি নষ্ট করে ফেলেছে। আমার হাতে কিছু কাগজপত্র ছিল এবং ২০ হাজার টাকা ছিল, সেগুলোও নিয়ে গেছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সাহিদা বেগম বলেন, আমিনুল ইসলাম সুজন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু লোক নিয়ে এসে আজকে ম্যাডামের ওপর হামলা করেছে। তাকে চেয়ার থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দিয়েছে। একজন মহিলা শিক্ষকের ওপর যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে; তা সহ্য করার মতো নয়। তিনি এখন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি আছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হবার পর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাসিনা ইসলামকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে হাইকোর্ট থেকে একটি রায় এসেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেছেন আমাকে যোগদান করার জন্য। কিন্তু তিনি চেয়ার ছাড়ছেন না। এই কারণে তার সঙ্গে একটু ঝামেলা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরা ভাঙার বিষয়ে অভিযুক্ত সিদলাই ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা বলেন, আমিনুল ইসলাম সুজন আমার চাচাতো ভাই। সে বলেছে আজকে স্কুলে যোগদান করবে। এজন্য আমাকে থাকতে বলেছে। আমি তার সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিলাম। আমি কোনো কিছুই করিনি। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি। তাদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি সেলিম আহমেদ বলেন, এমন একটা বিষয় শুনেছি। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা জাহান বলেন, আগের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম সুজন নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে ঝামেলা ছিল। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। এমন কাগজ আমাকে দেখিয়েছেন। আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাসিনা ইসলামকে বলেছি এগুলো দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
তিনি আরো বলেন, একজন নারী শিক্ষকের ওপর হামলা হয়েছে এ বিষয়টা আমি সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম সুজন আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। প্রায় এক মাস আগে জেল থেকে জামিনে বের হন তিনি।