হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত অতিবৃষ্টিতে ফের নগরীতে জলাবদ্ধতা

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুর্ভোগে দিন কাটছে বাসিন্দাদের। রোববার জেলার বাঁশখালীর বাহারছড়া থেকে তোলা। মিনহাজ ঝন্‌টু

টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও ফটিকছড়ি উপজেলার বেশিরভাগ বাড়িঘর এখনো পানিতে নিমজ্জিত। কিছু এলাকায় পানি কমলেও নতুন করে প্লাবিত হয়েছে অনেক এলাকা। ইতোমধ্যে একদিনের বিরতি দিয়ে গত শনিবার রাত থেকে ফের অতিভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে নগরীতে। এতে গতকাল রোববার সকাল থেকে মহানগরের নিচু এলাকাগুলো আবারও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে।

একদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক জনপদে বন্যার স্থায়ী রূপ, অন্যদিকে মহানগরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে থই থই পানি। সব মিলিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত জেলায় ১৩ জন মারা গেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাছাড়া গত ৪ জুলাই রাত থেকে শুধু শহর এলাকায় এক হাজার ৩৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। পুরো জেলা হিসাব করলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আড়াই হাজার মিলিমিটার ছাড়াবে। আবহাওয়া অফিস আরো জানায়, আগের চেয়ে দৈনিক গড় বৃষ্টিপাত কমলেও পাহাড়ি ঢলের কারণে বাঁশখালী-সাতকানিয়াসহ উপজেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত এলাকা সাতকানিয়া উপজেলা। উপজেলার বাজালিয়া, কাঞ্চনা, আমিলাইশ, চরতি, ছদাহা, কেওছিয়া ইউনিয়ন ও সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এ এলাকাগুলোর পাশাপাশি উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নেও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তবে বর্তমানে সাতকানিয়া পৌরসভার পানি কমতে শুরু করেছে। যদিও

বেশিরভাগ ইউনিয়নের বাড়িঘরগুলো এখনো ৫০ শতাংশ পানিতে ডুবে আছে। প্রধান প্রধান রাস্তাঘাট ভেঙে সেখানে এক গ্রাম অন্য গ্রামের সঙ্গে, এক ইউনিয়ন অন্য ইউনিয়নের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে বহু ব্রিজ, কালভার্ট ও সেতু। গতকাল জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় ত্রাণ নিয়ে গেছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। এতে আগে যারা ত্রাণ পাননি তারাও শুকনো খাবার, সুপেয় পানি ও ওষুধ পেয়েছেন।

লাশ ভাসিয়ে নেওয়া হয় দাফনের জন্য

বন্যার পানিতে একটি লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে লোহাগাড়া উপজেলায়। কেওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ফোরকান গত শুক্রবার মারা যান। বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান ও উঠান পানিতে ডুবে থাকায় সেখানে গোসল ও দাফন করানো সম্ভব হয়নি। পরে ভেলায় ভাসিয়ে ৩০০ মিটার দূরে নেওয়া হয় লাশটি। সেখান থেকে একটি অটোরিকশাযোগে দূরবর্তী দস্তিরহাটে নিয়ে একই দিন রাতে দাফন করা হয়। তবে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অনেক জায়গায় কবরস্থানের পাড় ভেঙে লাশ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

সাতকানিয়ার পার্শ্ববর্তী লোহাগাড়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নের পানি এখনো কমেনি। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেই কমতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি আগের মতোই আছে বাঁশখালী উপজেলায়। উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম এখনো প্লাবিত। তবে কয়েকটি ইউনিয়নে পানি কমতে শুরু করেছে। যেসব এলাকায় পানি কমছে সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা দুর্গত মানুষ নিজ ভিটেমাটির টানে ঘরে ফিরছেন। তবে বাড়ি ফিরে তারা শুধুই ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন দেখছেন।

টানা জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল, বৈলছড়ি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গ্রামের অসংখ্য মাটির ঘর এবং বেড়ার তৈরি কাঁচা বাড়িঘর ধসে পড়েছে। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় এসব ঘরের দেয়াল ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে একপর্যায়ে ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন পর নিজের চিরচেনা বসতভিটার এমন বিধ্বস্ত ও কঙ্কালসার রূপ দেখে অনেক পরিবারই এখন নির্বাক ও দিশাহারা। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে জীবন সচল করতে অনেকেই ভাঙা ঘর জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে থাকার উপযোগী করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানায়, দুর্গতদের হাহাকার এখনো কাটেনি। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের অভিযোগ সাতদিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের কাছে সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের জরুরি খাদ্য সহায়তা কিংবা ত্রাণ পৌঁছেনি। অনেক স্থানে একাধিকবারও ত্রাণ যাচ্ছে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে ত্রাণ দেওয়ায় অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে ঘরবাড়ি হারানোর কষ্টের পাশাপাশি তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটে দিন কাটছে এ বানভাসি মানুষের।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মূলত ভারত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় বাঁশখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়ায় বন্যা দেখা দেয়। কেননা কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড়ে। তাছাড়া সাঙ্গু নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতে না হলেও নদীটি বান্দরবান ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীর গতিপথ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভারতের পাহাড়ি ঢল নদীতে প্রবেশ করে নদীর পানি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে সাঙ্গু নদী, ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ জানান, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী সংলগ্ন নদী ও খালগুলোতে এখনো বিপৎসীমার ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত কমলেও পাহাড়ে ভারি বৃষ্টি অব্যহত রয়েছে। মূলত পাহাড়ি ঢলের কারণেই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কর্ণফুলি, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ডলুসহ সবকটি নদীর ক্যাশম্যান এড়িয়ে সংকুচিত হওয়ায় এতবড় পাহাড়ি ঢলের চাপ নদীগুলো সামলাতে পারছে না।

নগরে ফের জলাবদ্ধতা

এদিকে একদিন বিরতি দিয়ে আবারও জলাবদ্ধতা ফিরেছে চট্টগ্রাম নগরে। শনিবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত অব্যাহত ভারি বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নগরের চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, টেরিবাজার, বহদ্দারহাট, হামজারবাগ, ফিরোজশাহ, বিশ্বকলোনিসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যায়। নিচু এলাকার অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দারা কষ্টে পড়েন। নগরের প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে পানি জমে থাকায় ও যত্রতত্র খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাহত হয় যান চলাচল। এতে কর্মজীবী মানুষেরা সীমাহীন দুর্ভোগ পড়ে। শনিবার রাতে অনেক স্কুলে পরীক্ষা ও ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও গতকাল তা আবার পরিবর্তন করা হয়। জলাবদ্ধতার কারণে কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামে দুই প্রতিমন্ত্রী

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রলালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকালও তারা নগর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারের পক্ষে ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার, পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয় করেছেন। নগরের চান্দগাঁও এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শেষে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে সমন্বিতভাবে কাজ করছে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন। প্রয়োজনীয় সহায়তা চলমান থাকবে। জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাবে। প্রধানমন্ত্রীও নিবিড়ভাবে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নজরে রাখছেন।

নাহিদ-হাসনাতের ত্রাণ বিতরণ

এদিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, অনেক জায়গায় সরকারি সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা যেভাবে থাকার কথা, সেভাবে দেখছি না। তবে সরকার সবকিছু করতে পারবে তা-ও না। তারা একা সামাল দিতে পারবে না এ পরিস্থিতি, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

নোয়াখালীতে আলমারি খুলতেই বিষাক্ত সাপের দংশন, প্রাণ গেল গৃহবধূর

ঈদগাঁওয়ে ফাঁস লাগানো যুবকের লাশ উদ্ধার

সীতাকুণ্ডে আবুল খায়ের স্টিল মিলের ‘কৃত্রিম জলাবদ্ধতা’

সীতাকুণ্ডে জলাবদ্ধতার প্রতিবাদে কারখানার গেটে অবরোধ

রামুতে বন্যার পানিতে পড়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু

বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে শত শত মানুষের ভিটামাটি

চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে যুবক নিহত

সরকারের কেউ আসেনি, সরকার পারছে না: নাহিদ ইসলাম

আট বছর পর গতি পেল চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্প

সীতাকুণ্ডে পুলিশি অভিযান ঘিরে উত্তেজনা, নারীর মৃত্যু