আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে বইছে ভোটের হাওয়া। তবে উৎসবের এই আবহ স্পর্শ করছে না নারী ভোটারদের বড় একটি অংশকে। আসন্ন নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী, অথচ তাদের একটি বড় অংশই এখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘সব ঠিক আছে’ বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে নারী ভোটারদের আস্থা ফেরানোর মতো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, সন্দ্বীপে নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৬০ জন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি নারী ভোটার রয়েছে রহমতপুর ইউনিয়নে (১৯ হাজার ২৪২ জন), দ্বিতীয় অবস্থানে মুছাপুর ইউনিয়ন (১৮ হাজার ৪৮২ জন) এবং তৃতীয় অবস্থানে মগধরা ইউনিয়ন (১৪ হাজার ৪১৯ জন)। বিশাল এই নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা থাকলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
মাঠ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, পূর্বের নির্বাচন সমুহের সহিংসতা এবং কেন্দ্র দখলের আতঙ্ক কাটছে না নারীদের মন থেকে। রহমতপুর ইউনিয়নের গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, ভোট দিতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, কিন্তু পথে বা কেন্দ্রে যদি মারামারি হয় তবে কে আমাদের রক্ষা করবে? প্রশাসনের কেউ তো এসে আমাদের আশ্বস্ত করেনি যে আপনারা নির্ভয়ে ভোট দিতে আসুন।
মুছাপুর ইউনিয়নের একজন কর্মজীবী নারী রেহানা আক্তার বলেন, বিগত সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। প্রশাসন যদি এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার না করে, তবে আমাদের মতো নারীদের পক্ষে কেন্দ্রে যাওয়া কঠিন হবে।
মগধরা ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা নাসরিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছি, অথচ ভোটের অধিকার নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কায় থাকি। সন্দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এবং কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ বিবেচনায় নারীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
ভোটের এই ভীতি কেবল দ্বীপের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়েছে সন্দ্বীপের বাইরে থাকা ভোটারদের ওপরও। চট্টগ্রাম শহরে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাসরত সন্দ্বীপের একাধিক নারী ভোটারের সাথে কথা বলে জানা যায়, নাড়ির টানে তারা এলাকায় যেতে চাইলেও ‘ভোটের পরিবেশ’ নিয়ে চরম সংশয়ে আছেন। তাদের স্পষ্ট কথা—অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিতে তারা সন্দ্বীপে ফিরবেন না।
শহরে বসবাসরত নারী ভোটার আসমা বলেন, ভোটের দিন এলাকায় যে ধরণের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাতে আমাদের মতো সাধারণ নারীদের জন্য যাতায়াত করাটাই বড় বিপদ। প্রশাসন যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে মিছেমিছি হয়রানি হতে সন্দ্বীপে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। এই নারী ভোটারদের বড় একটি অংশ অনুপস্থিত থাকলে তা ভোটের হারের ওপর বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
নারীদের এই প্রকাশ্য ভীতি ও উদ্বেগ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মংচিংনু মারমার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি গতানুগতিক আশ্বাসের বাণী শোনান। তিনি দাবি করেন, ভোটারদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এখন পর্যন্ত নারী ভোটারদের ভয় কাটাতে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা, উঠান বৈঠক বা বিশেষ নিরাপত্তা মহড়া দিতে দেখা যায়নি উপজেলা প্রশাসনকে। মাঠ পর্যায়ে কোনো বাস্তব প্রমাণ না থাকায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সন্দ্বীপ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জায়েদ নূর বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে পুলিশের এই তৎপরতা কেবল নিয়মিত ডিউটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ভোটারদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ‘সেফ প্যাসেজ’ বা ‘হেল্পলাইন’ চালুর বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি।