শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে নিরীহ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ওপর নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। সরকারি নির্দেশনায় সেদিন রাতে পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির নির্বিচার গুলিবর্ষণে মাদরাসা শিক্ষার্থী-আলেমসহ অসংখ্য নিরীহ মুসল্লি শহীদ হন। সেই বিভীষিকাময় দিনে অগণিত মুসল্লির সঙ্গে হাফেজ রেজাউল করিমও আহত হন। এক যুগের বেশি সময় আগের সেই ভয়ানক স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
হাফেজ রেজাউল করিম তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি হেফাজতে ইসলাম লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের বর্বরতম সেই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রেজাউল করিম বলেন, সেদিন সকালে যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা থেকে বের হই। দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটে স্লোগানে। সকাল ১০টার দিকে সাইনবোর্ড, শনির আখড়ার দিক থেকে ওলামায়ে কেরাম এসে যোগ দেন। এতে আমাদের বড় একটা কাফেলা হয়।
আমরা কাফেলা নিয়ে শাপলা চত্বরের উদ্দেশে রওনা হই। আমরা যখন বঙ্গ ভবন মোড়ে পৌঁছাই তখন আমাদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। আমরা তখন বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিই এবং আধা ঘণ্টা পরে আবারও সবাই একত্রিত হই।
শাপলা চত্বরে ফ্যাসিবাদী হাসিনার পোষা বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, পরে সেখান থেকে আমরা শাপলা চত্বরে চলে যাই। দুপুরের দিকে আমরা বায়তুল মোকাররম অভিমুখে রওনা হই। দৈনিক বাংলা মোড়ে যখন আসি তখন যৌথ বাহিনী আটকিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থানের পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আমরা যখন বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইট পার হয়ে আজাদ প্রোডাক্টের সামনে যাই তখনই আমাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। অনেকেই তখন আহত হয়। আমার ডান পায়ে একটা গুলি লাগে।
রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় যৌথ বাহিনীর নৃশংসতার বর্ণনা দিয়ে শাপলা চত্বরে আহত হওয়া এই মুসল্লি বলেন, আমি পায়ে বুলেট নিয়ে কয়েকজনের সহযোগিতায় অনেক কষ্ট করে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিই। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে দৈনিক বাংলা মোড়ে এসে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। চারদিকে অবিরাম গুলিবর্ষণ চলছে।
অনেক ভাইকে চোখের সামনে দেখছি রক্তাক্ত অবস্থায়। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সগুলো তখন আহতদের নিয়ে যাচ্ছিল। একটা পর্যায়ে আমি অনেক কষ্ট করে আমার মাদরাসায় চলে আসি।
তিনি বলেন, মাদরাসার গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে ঢুকতে পারেনি। বাইরে গুলিবর্ষণ চলছিল। বেলা ৩টার দিকে বৃষ্টিতে ভিজে যাত্রাবাড়ী আড়তে গিয়ে লুকালাম। সেখান থেকে কুমিল্লার একটি বাসে উঠলাম। এরপর বাড়িতে এসে গোপনে চিকিৎসা নিলাম। কিন্তু ভয়ে কখনো বলতে পারিনি যে আমি শাপলা চত্বরে আহত হয়েছি।
শাপলা চত্বরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে হাফেজ রেজাউল করিম বলেন, আমরা চাই এ দেশের মাটিতে আর যেন নিরপরাধ মানুষের রক্ত না ঝরে। অনেক ঝরেছে। যারা এ নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত, যারা এ নৃশংসতা করেছে, এর পেছনে যাদের গাদ্দারি আছে তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। এটা আমাদের দাবি। আমরা চাই শাপলা গণহত্যার যথাযথ বিচার যেন হয়।