জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে এবার সাড়ে আট শতাংশ মাশুল বাড়িয়েছে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা। গতকাল সোমবার সকালে স্টেকহোল্ডারদের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও মূলত রোববার রাত ১২টা এক মিনিট থেকে নতুন নির্ধারিত মাশুল কার্যকরের কথা জানানো হয়েছে চিঠিতে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিজিএমইএসহ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের দাবি, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করে ট্যারিফ নির্ধারণ কমিটির অনুমোদন ছাড়া একতরফাভাবে মাশুল বাড়ানোর কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। আর বিকডার দাবিÑমাশুল নয়, তেলের দাম বাড়ার কারণে ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে তারা।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত অংশ হিসেবে কাজ করে ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডক কর্তৃপক্ষ। রপ্তানি পণ্যের শতভাগ আর ৬৪ ক্যাটাগরির আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয় এসব অফডকে। বছরে গড়ে তিন লাখ আমদানি এবং সাড়ে সাত লাখ রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয় ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ট্যারিফ কমিটি এসব অফডকের মাশুল নির্ধারণ করে থাকে। কোনো কারণে মাশুল বাড়াতে বা কমাতে হলে এই ট্যারিফ কমিটির অনুমোদন নিয়ে তা বাস্তবায়ন করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ট্যারিফ কমিটি কিংবা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই গতকাল সকালে মাশুল বাড়ানোর চিঠি পাঠায় বিকডা।
বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার জানান, অফডক পরিচালনায় যেসব মেশিনারিজ চলে, তার সবগুলোই জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিপো থেকে বন্দরে কনটেইনার জাহাজিকরণ করা হয় লরি দিয়ে। সেগুলোও ডিজেলে চলে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকার কাছাকাছি বাড়িয়েছে। সবগুলো অফডক মিলে দৈনিক ৬৫-৭০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। এতে অফডক পরিচালনা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এত বড় ধাক্কা অফডক কর্তৃপক্ষ এককভাবে সামলাতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে বর্ধিত জ্বালানি তেলের একটি অংশ হিসাব করে মাত্র সাড়ে আট শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে।
এখানে মাশুল বাড়ানো হয়নি। এরপরও অফডক কর্তৃপক্ষকে বড় ধরনের লোকশান গুনতে হবে।
ট্যারিফ কমিটি কিংবা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করা প্রসঙ্গে রুহুল আমিন শিকদার বলেন, হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় অপারেশন অব্যাহত রাখার স্বার্থে ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করতে হয়েছে। আর ট্যারিফ কমিটি গঠন করা হয়েছে অনেক আগেই; কিন্তু সেটা কখনই কার্যকর হয়নি।
অফডকের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী জানান, বৈশ্বিক সংকটে এমনিতেই সবাই টিকে থাকার লড়াই করছে। বিশ্ববাজারে দেড় মাস আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সরকার দাম বাড়িয়েছে মাত্র দুদিন আগে। দেশের আর কোনো সেক্টর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার এই অজুহাতকে এত দ্রুত কাজে লাগায়নি। কিন্তু অফডক কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা যাওয়ার আগেই মাশুল বাড়ানোর যে চিঠি দিয়েছে, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়া একতরফাভাবে ভাড়া বাড়ানোর এ ঘটনা দেশের বাজারে আরেক দফা অস্থিরতা তৈরি করবে। সে সঙ্গে অন্যান্য সেক্টরও ভাড়া বাড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির একটি সুযোগ পেল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, অফডকগুলো বন্দরের একটি বর্ধিত অংশ। এনবিআরের নিয়ম আর বন্দর আইনেই এটি পরিচালিত হয়। এখানে এক পয়সা ভাড়া বাড়াতে হলে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু অফডক কর্তৃপক্ষ কখনই কোনো নিয়ম মানে না। তারা একতরফাভাবে মাশুল বাড়িয়ে একটি অস্থিরতা সৃষ্টি করে তারপর সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু বৈশ্বিক এই সংকটের মাঝে এমন চালাকি কারো কাম্য নয়। সরকার তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। কদিনের মধ্যে এটা কমে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় রাতারাতি ফুয়েল সারচার্জের নামে মাশুল বৃদ্ধির এমন ঘটনা অস্থির করে তুলতে পারে জাতীয় অর্থনীতিকে। বর্ধিত এই মাশুল এখনই স্থগিত রাখা উচিত। সবার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে যৌক্তিকভাবে পরে বাড়ানো যেতে পারে। একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।