লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে ৪১ বছর ধরে একটি জামে মসজিদের প্রায় ২৬ কোটি টাকার সম্পত্তি প্রভাবশালী একটি মহলের দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারের এ জমি মসজিদের নামে ওয়াক্ফ করা। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েক ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে তা নিজেদের নামে রেকর্ড করে বহু বছর ধরে ভোগদখল করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মসজিদের জন্য ওয়াক্ফকৃত ৬৯ শতাংশ জমির মধ্যে ৫২ শতাংশই স্থানীয় প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছেন। এ জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যক্তিগত দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয়রা জানান, এ জমির দাম প্রায় ২৬ কোটি টাকা। অথচ টাকার অভাবে মসজিদের বেহালদশা।
সম্প্রতি চরমার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ছিদ্দিক উল্লাহ দোকান নির্মাণ করতে গেলে মসজিদ কমিটির লোকজন বাধা দেন। এতে বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতিটি দোকান ভিটির দাম ৫০-৬০ লাখ টাকা বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরমার্টিন এলাকার ছিদ্দিক উল্লাহ মুন্সি ১৯৮৪-৮৫ সালে ৬৯ শতাংশ জমি মুন্সিরহাট বাজারে মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ করেন। বিষয়টি মসজিদ কমিটির তৎকালীন সভাপতি মৃত খবিরুল ইসলাম, সেক্রেটারি নুরুজ্জামান মোল্লা, স্থানীয় প্রভাবশালী মৃত ছৈয়দ আহমদ, আবদুল লতিফ মেম্বার, শাহে আলম, খোরশেদ আলম মেম্বার, আবু বকর ছিদ্দিক, নুরু মিয়া দরবেশ, হাবিব উল্লাহ মিয়া এবং শরিয়ত উল্লাহ মিয়াসহ অনেকের নজরে পড়ে। পরে ১৯৮৯-৯০ সালে জমির নতুন রেকর্ড কার্যক্রম শুরু হলে কৌশলে তারা মসজিদের ৫২ শতাংশ জমি বাজারের দোকান ভিটি উল্লেখ করে নিজেদের নামে রেকর্ড করে দখলে নেন। বাকি ১৭ শতাংশ জমি বাজারের গলি হিসেবে ১ নম্বর খাস খতিয়ানে চলে যায়।
এরপর ওই দখলদারদের অনেকে রেকর্ড মূলে বিশাল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন সময় এসব দোকান ভিটি বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করেন। দীর্ঘদিন থেকে কেউ রেকর্ড মূলে ক্রয় করে আবার অনেকে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়ে ওই সব দোকানঘর ভাড়া দিচ্ছেন অথবা ব্যবসা করছেন।
জমিদাতা ছিদ্দিক উল্লাহ মুন্সির এক ছেলে ফারুক মুন্সি আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাজারের কিছু দোকানঘর নিজেদের দাবি করেন এবং প্রভাব খাটিয়ে বাজারের সেক্রেটারি হন। পরে কিছু ভিটির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি এখনো চলমান।
এছাড়া দখলদারদের অনেকের দাবি, ছিদ্দিক উল্লাহ মুন্সি মসজিদের জন্য জমি দান করার পর আবার তাদের কাছে ভিটি হিসেবে বিক্রি করেন। কিন্তু ছিদ্দিক উল্লাহ মুন্সির কাছ থেকে জমি কেনার কোনো দলিল এবং নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ কিংবা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তারা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে, চরমার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিদ্দিক উল্লাহ মেম্বার দাবি করেন, রেকর্ড মূলে ওয়ারিশ সূত্রে তিনি এ জমির মালিক। এ কারণে তিনি দোকানঘর নির্মাণ করছেন।
এ বিষয়ে জমিদাতা ছিদ্দিক উল্লাহ মুন্সির আরেক ছেলে মসজিদের বর্তমান সভাপতি বাবুল মুন্সি বলেন, আমার বাবা এ মসজিদে ৬৯ শতক জমি দান করেন। পরে আমার বাবার নামে বাজার হওয়ার পর ৫২ শতাংশ জমি একটি চক্র কৌশলে তাদের নামে রেকর্ড করে নিয়ে দখল করেন।
তিনি আরো বলেন, এখন বিএনপি সরকার গঠনের পর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিদ্দিক উল্লাহ মসজিদের পাশের একাংশ তাদের নামে রেকর্ড আছে বলে দোকানঘর নির্মাণ করছেন। আমরা মসজিদের বিভিন্ন কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করার পর প্রকৃত ঘটনা জানতে পারি। এই মুহূর্তে মসজিদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে তিনি দাবি করেন।
মসজিদ কমিটির বর্তমান প্রচার সম্পাদক আলী হোসেন বলেন, মসজিদটির অবকাঠামো ও দেয়াল দীর্ঘদিন থেকে জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় আছে। এখন জানতে পারি মসজিদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি অনেকের দখলে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সমাধানের জন্য তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আরাফাত হোছাইন জানান, মসজিদের জায়গায় দোকানঘর নির্মাণের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।