নরসিংদীতে শীতলক্ষ্যা নদীতে বেশ কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল পরিমাণ মাছ মরে ভেসে উঠছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের মধ্যে সাময়িক আনন্দ দেখা গেলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। গত কয়েক দিন ধরে যে পরিমাণ মাছ মরে ভাসছে; তাতে ভবিষ্যতে নদীর একাংশ মাছশূন্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও সপ্তাহখানেক ধরে শীতলক্ষ্যায় অনেক মাছ মরে ভেসে উঠছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে শীতকালের শেষে বছরের এই সময়ে নদীটিতে এই চিত্র দেখা যায়। আর এসব মাছ ধরতে নদীর দুই তীরের মানুষের হিড়িক পড়ে।
জানা যায়, এভাবে শীতলক্ষ্যার মাছ মরার কারণ আশপাশের কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও কেমিক্যাল। নদীর দুই তীরে থাকা কারখানার বিষাক্ত আবর্জনা ও শিল্পবর্জ্য বছরের পর বছর ধরে পানিতে মিশে তা দূষিত করছে। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। ধ্বংস হচ্ছে জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব। নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ। বিপর্যয় ঘটছে নদীর পরিবেশে। নদীর পরিস্থিতি বিপন্ন হওয়ায় বাধ্য হয়ে পেশা বদলাচ্ছেন নদী পাড়ের জেলেরা।
জানা গেছে, নদী রক্ষায় স্থানীয় পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীরা উদ্যোগ নিলেও প্রশাসনের জোরালো পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ও কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর ফলে নদীর পানিকে দূষণমুক্ত করা যাচ্ছে না। এতে নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নরসিংদী, গাজীপুর, ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী। বৃহত্তর নদীগুলোর মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী। এটি গাজীপুরের টোকের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে নারায়ণগঞ্জের কলাগাছিয়ার কাছে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ১০৮ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ২২৮ মিটার। নারায়ণগঞ্জের কাছে এটি প্রায় ৩০০ মিটার পর্যন্ত চওড়া। নদীর দুপাড়ের মানুষের কাছে এটি শীতলক্ষ্যা ও লক্ষ্যা নদী নামে পরিচিত।
মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, একসময় শীতলক্ষ্যার গাজীপুর ও নরসিংদী অংশ থেকে প্রতিবছর ৫০০ মেট্রিক টন মাছের সরবরাহ পাওয়া যেত।
স্থানীয়রা জানান, দেশীয় মাছের অন্যতম ভান্ডার ছিল এই শীতলক্ষ্যা নদী। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার শিল্পকারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য ক্ষিরু ও মাটিকাটা নদীর মাধ্যমে শীতলক্ষ্যার পানিতে পতিত হয়ে তা দূষিত করছে। নদীর পানি কালো ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে বিপর্যয়ে পড়েছে নদীটির জলজ প্রাণী ও মাছ।
তারা জানান, ভালুকার বিভিন্ন কারখানার শিল্পবর্জ্য সুতিয়া নদীর মাধ্যমে শ্রীপুরের সাওরাইদ ইউনিয়নের জয়দেবপুর এলাকায় প্রবেশ করে। পরে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলার ত্রিমোহনী এলাকায় গিয়ে এসব বর্জ্য শীতলক্ষ্যায় পড়ে। এতে নদীটির পানি বিষাক্ত হয়।
নদীতীরের বাসিন্দারা জানান, নরসিংদীর পলাশের অংশে চরসিন্দুর ফেরিঘাট থেকে ঘোড়াশাল রেল ব্রিজ পর্যন্ত এলাকায় শীতলক্ষ্যায় অসংখ্য ছোট-বড় মাছ মরে ভেসে উঠেছে। এর মধ্যে রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে।
তারা আরো বলেন, শিল্পবর্জ্যের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই মাছের উৎপাদন কমেছে। এখন আর নদীতে তেমন মাছ পাওয়া যায় না। প্রতি বছরের এই সময়ে মাছ মরে ভেসে ওঠে। এভাবে মাছশূন্য হয়ে পড়ছে শীতলক্ষ্যা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পলাশ উপজেলার অভ্যন্তরে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যার পাড়ে বেশ কিছু বৃহৎ শিল্পকারখানা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইটিপি (বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা) থাকলেও রাতের আঁধারে তা বন্ধ করে রাখা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইটিপি না থাকায় বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের প্রভাবে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি কোথাও লাল আবার কোথাও কালচে বর্ণ ধারণ করছে। এতে বিপন্ন হয়ে পড়ছে নদীর জীববৈচিত্র্য।
পলাশের সুলতানপুর গ্রামের অতিন্দ্র চন্দ্র বর্মন শৈশব থেকেই শীতলক্ষ্যায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তার পূর্বপুরুষেরাও এই নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যায় একসময় চিংড়ি, বাউশ, বাইম, রিঠা, বোয়াল মাছসহ শত প্রজাতির অবাধ মাছের ভান্ডার ছিল। কিন্তু কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল সরাসরি নদীর পানিতে পড়ে বিষক্রিয়ায় নদীর সব মাছ মরে ভেসে ওঠে। আজ কয়েক বছর ধরে নদীর পানি কমে এলে এই সময়টাতে কারখানার দূষিত পানির কারণে নদীটি মাছশূন্য হয়ে পড়ে।
চরসিন্দুর বাজার এলাকার মারুফ জানান, নদীতে পাওয়া মরা মাছের মধ্যে দূষিত কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যায়। অধিকাংশ মাছের পেটেই ডিম পাওয়া যায়।
স্থানীয় রাকিব মিয়া জানান, প্রতি বছরের এই সময়টাতে শীতলক্ষ্যার পানি কমে আসে। তখনই এই নদীর ছোট-বড় মাছের পেটে ডিম আসে। আর এই অবস্থাতেই নদীর মাছগুলো মরে পানিতে ভেসে ওঠে। মরে ভেসে ওঠা মাছগুলোতে দূষিত কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যায়। কারখানার দূষিত কেমিক্যাল নদীতে ফেলার কারণে পানি দূষিত হয়ে মাছগুলো মরছে।
এ বিষয়ে জীবন ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি সরোয়ার পাঠান জানান, শীতলক্ষ্যার পানি দূষণের কারণে জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়েছে। শিল্পবর্জ্যের সঙ্গে কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি নদীতে পড়ে পানি বিষাক্ত হয়। যেভাবে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে, তাতে এই পরিবেশে জলজ প্রাণী বসবাস অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের এই চিত্রে হতাশাও তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এ সময়টাতে নদীতে পানি কমে যায়। একই সঙ্গে শিল্প কারখানার বর্জ্য নদীকে বিষাক্ত করে তোলে। নদীর পানিতে অক্সিজেনের সংকট তৈরি হয়ে মাছসহ জলচর প্রাণীগুলো বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ হারিয়েছে। এজন্য শিল্পকারখানার দূষণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বিষয়ে নরসিংদী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বদুরুল হুদা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নদীপাড়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ ও কাপাশিয়া উপজেলার কিছু কারখানার দূষিত কেমিক্যালে শীতলক্ষ্যার মাছ মারা যাচ্ছে। আমাদের অফিস থেকে এ দুই উপজেলাকে চিঠি দেওয়া হবে কারখানাগুলো পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।