মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি এক সময় ছিল গৌরব, ঐশ্বর্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনাটি সময়ের বিবর্তনে আজ ধ্বংসের মুখে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অবহেলা এবং দখলদারিত্বের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা। এটি রক্ষায় দ্রুত সরকারের পদক্ষেপ আশা করেছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, তেওতা জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাবু হিম শংকর রায় চৌধুরী ও কিরণ শংকর রায় চৌধুরী। যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় আট একর জায়গাজুড়ে আঠারো শতকের শেষদিকে গড়ে ওঠে এই বিশাল প্রাসাদ। সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্মিত এই বাড়িটি একসময় মানিকগঞ্জ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখান থেকেই পরিচালিত হতো শাসনব্যবস্থা, কর আদায় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।
জমিদার বাড়িটিতে মোট ৫৫টি কক্ষ রয়েছে। বাড়ির সামনে রয়েছে শান বাঁধানো বিশাল ঘাটসহ লাল শাপলার পুকুর, যার জলে প্রতিফলিত হয় প্রাসাদের মনোরম অবয়ব। মনে হয় যেন পানির নিচে আরেকটি রাজপ্রাসাদ লুকিয়ে আছে।
এছাড়া প্রাসাদের ভেতরে আরেকটি পুকুর রয়েছে, যদিও বর্তমানে তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। প্রাসাদের সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ এবং চারপাশে সারি সারি তালগাছ পুরো পরিবেশকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
তিনতলাবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি পোড়া মাটির ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। কাঠ, লোহা এবং চীনা মাটির সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি প্রতিটি অংশ ছিল নিপুণ শিল্পকর্মের উদাহরণ। দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র তৈরি হয়েছিল মজবুত শাল কাঠ দিয়ে।
প্রাসাদের উত্তর পাশে ছিল একটি নাটমন্দির, যেখানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূজা-অর্চনা করতেন। মন্দিরের ভেতরে ছিল বিভিন্ন দেবদেবীর পিতলের মূর্তি।
এখানে জমিদারদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কক্ষ ছিল, এমনকি কয়েদিদের আটকে রাখার জন্য বন্দিশালাও ছিল। প্রাসাদের মাঝখানে ছিল অন্দরমহল। প্রজারা কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের পূর্বদিকে অবস্থিত অন্ধকূপে বন্দি করে রাখা হতো। দক্ষিণ পাশে দুটি অট্টালিকার মাঝখানে টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশাল নাট্যশালা, যেখানে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল নবরত্ন দোলন মঞ্চ। প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ ফুট উচ্চতার এই নবরত্ন মঠটি ১৮৫৮ সালে নির্মিত হয় এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম নবরত্ন মঠ হিসেবে পরিচিত। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ১৯০৬ সালে পুনরায় সংস্কার করা হয়। জমিদাররা একসময় এখানে মাসব্যাপী দোলযাত্রার আয়োজন করতেন, যা ছিল এলাকার অন্যতম প্রধান উৎসব।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই জৌলুস হারিয়ে গেছে। দেবদাসীদের নৃত্য, শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া—সবই আজ অতীতের স্মৃতি। এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
তেওতা গ্রামের বিশেষ গুরুত্ব বেড়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতির কারণে। প্রমীলা দেবী ছিলেন তেওতা গ্রামেরই মেয়ে। তার ডাকনাম ছিল দুলি। তিনি বসন্ত কুমার সেন ও গিরিবালা সেন দম্পতির কন্যা। জমিদার হিম শংকর রায় তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। নজরুল ইসলাম প্রায়ই এই জমিদার বাড়িতে আসতেন এবং রাতভর গান ও কবিতার আসর বসাতেন।
প্রমীলাকে প্রথম দেখেই মুগ্ধ হয়ে নজরুল রচনা করেন বিখ্যাত গান— ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ।’ ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে এবং একসময় তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর নজরুল নববধূকে নিয়ে আবার তেওতায় আসেন এবং প্রায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করেন। সেই সময় প্রতি রাতে জমিদার বাড়িতে বসত সংগীত ও কবিতার আসর। ধারণা করা হয়, এই স্থানেই নজরুল তার বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন।
বর্তমানে প্রমীলা দেবীর জন্মভিটাও সেখানে বিদ্যমান, যা পর্যটকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। বিশেষ দিবসে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী এখানে সরকারিভাবে পালন করা হয়।
তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই জমিদার বাড়িটি আজ ধ্বংসের মুখে। ইতোমধ্যে বাড়ির অনেক মূল্যবান অংশ যেমন লোহার রড, অ্যাঙ্গেল এবং পাথরের নিদর্শন চুরি হয়ে গেছে। দেয়ালের অংশ ভেঙে পড়ছে, আঙিনা দখল হয়ে গেছে অবৈধ বসতিতে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, নজরুল-প্রমীলার বহু স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িটি বর্তমানে সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বনভোজনের জন্য এখানে আসেন।
এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসেন। তবে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তারা দিনে এসে দিনেই চলে যান। জমিদার বাড়িটি সংস্কার না করায় তার নিজস্থ সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সম্প্রতি বাড়িটি অধিগ্রহণ করলেও এর রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলেও তিনি জানান।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবির বলেন, সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে জমিদার বাড়িটি সংস্কার এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। পর্যটকদের আনাগোনায় এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যও বাড়বে। জরুরি ভিত্তিতে কবি কাজী নজরুল স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।