মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচিতে অনিয়ম
মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের জন্য সরকারের দেওয়া খাদ্য সহায়তার চালই হয়ে উঠেছে বিতর্কের কারণ। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নে অভিযোগ উঠেছে—প্রাপ্য ৮০ কেজির পরিবর্তে জেলেদের ৬ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত চাল কম দেওয়া হয়েছে। ফলে দুই মাসের জীবিকার একমাত্র ভরসা নিয়েও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন অসহায় জেলেরা।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সকালে উপজেলার সখিপুর থানাধীন দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফের চাল বিতরণকালে এ অনিয়মের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
সরেজমিনে গিয়ে ও উপকারভোগী জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম এলাকায় ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সহায়তায় মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে কার্ডধারী প্রতিটি জেলেকে ৮০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে। দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নে এ কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ৫০ জন জেলের জন্য চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান ট্যাগ অফিসার উপস্থিত হওয়ার আগেই সকাল ৭টা থেকে নিজস্ব লোকজন নিয়ে চাল বিতরণ শুরু করেন। নিয়ম অনুযায়ী চাল মেপে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা না মেপেই বিতরণ করা হয়। এতে অধিকাংশ জেলে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল পান।
ভুক্তভোগী জেলে রকিব মাঝি জানান, আমার ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেওয়া হয়েছে ৭০ কেজি। কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, চাল কম এসেছে। আমরা গরিব মানুষ—কথা বললেও কেউ শুনবে না।
মাল বাজার এলাকার ফয়সাল হোসেন বলেন, বাবার নামে বরাদ্দ চাল নিতে এসে তিনি দেখেন ৮০ কেজির স্থলে ৭২ কেজি দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান বলেছেন উপজেলা থেকে চাল কম এসেছে। কিন্তু সাংবাদিকরা আসার পর আবার ৮০ কেজি করে দেওয়া শুরু হয়।
আরেক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের নির্দেশ মেনে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সহায়তার চাল থেকেও যদি কম দেওয়া হয়, তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?
চাল বিতরণে অনিয়মের খবর পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হকের নির্দেশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে. এম. রাফসান রাব্বি ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল ইমরান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অনিয়মের সত্যতা পান। তাদের তত্ত্বাবধানে পরবর্তীতে অবশিষ্ট জেলেদের মধ্যে সঠিক পরিমাণ চাল বিতরণ করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান দাবি করেন, তিনি সঠিক মাপেই চাল বিতরণ করেছেন। তবে ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকার বলেন, বস্তাভেদে দুই-তিন কেজি চাল কম থাকতে পারে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ও সচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হক জানান, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে এবং তারা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল জেলেরা বলছেন, অভিযানকালীন এই চালই তাদের পরিবারের প্রধান খাদ্যভরসা। সেই সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে মানবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।