গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা উড়াল সেতুর নিচে ভোরের আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে এক ব্যতিক্রমধর্মী শ্রমের হাট। ফজরের আজান শেষ হতে না হতেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও কাঁধে দা, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন কাজের আশায়। এটি কোনো সাধারণ বাজার নয়, এ যেন শ্রম বিক্রির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বৃহস্পতিবার (০৭ মে) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এখানে বসে শ্রমিকদের অঘোষিত কর্মসংস্থান বাজার। ধান কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, দিনমজুর, মালামাল লোড-আনলোড শ্রমিক, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি—সব ধরনের শ্রমিক পাওয়া যায় এখানে। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত “শ্রমিকের বাজার” নামে।
এখানে শুধু পুরুষ শ্রমিকই নন, নারী শ্রমিকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে। পাশাপাশি কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের দেখা মেলে এই শ্রমের হাটে। কেউ এসেছেন সংসারের অভাব মেটাতে, কেউ পরিবার চালাতে, আবার কেউ এসেছেন জীবিকার তাগিদে শেষ বয়সেও শ্রম বিক্রি করতে।
সকালে বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের চোখে-মুখে স্পষ্ট অনিশ্চয়তার ছাপ দেখা যায়। কেউ এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান, আবার অনেকে কাজ না পেয়েই দুপুরের দিকে ফিরে যান বাড়িতে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে আসা ধান কাটার শ্রমিক মো. রফিক মিয়া বলেন, “ধান কাটার মৌসুমে এখানে ভালো কাজ পাওয়া যায়। কিন্তু সব দিন সমান না। কোনো দিন ৮০০ টাকা পাই, আবার কোনো দিন ৫০০ টাকাতেও যেতে হয়।”
শ্রীপুরের বরমী এলাকার দিনমজুর আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “সকালে আগে আসলে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দেরি করলে ঠিকাদার অন্য লোক নিয়ে যায়।”
রাজমিস্ত্রির সহকারী (জোগালি) শাহীন মিয়া বলেন, “এখানে প্রতিদিন দাঁড়াই। কখনো বিল্ডিংয়ের কাজ, কখনো মালামাল নামানোর কাজ পাই। কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়।”
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ হয়। ধান কাটার শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত। রাজমিস্ত্রিদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সহকারীরা কম পারিশ্রমিক পান। লোড-আনলোড শ্রমিকদের আয় নির্ভর করে ট্রাক বা মালামালের পরিমাণের ওপর।
অনেক সময় কাজ শেষে পুরো মজুরি না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে শ্রমিকদের। কেউ কেউ বকেয়া রেখে দেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মজুরি নিয়ে তর্ক-বিতর্কও হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ বলেন, “এখানে এমন কোনো শ্রমিক নেই যাকে পাওয়া যায় না। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ—সব ধরনের লোক পাওয়া যায়। অনেকেই ফোন করেও শ্রমিক ডাকেন।”
স্থানীয়দের মতে, শিল্পাঞ্চল ও কৃষি এলাকার সংযোগস্থল হওয়ায় মাওনা চৌরাস্তা শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও শ্রমিকরা এখানে আসেন কাজের আশায়।
এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা। কারও ছেলে স্কুলে পড়ে, কারও সংসারে অসুস্থ বাবা-মা। দিনের কাজই তাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা।
শ্রমিক নূর ইসলাম বলেন, “আমরা কাজ না করলে বাসায় চুলা জ্বলে না। তাই অসুস্থ থাকলেও বের হতে হয়।”
ভোরের আলো বাড়তে থাকলে একে একে শ্রমিকদের দল ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গন্তব্যে। কেউ ধান কাটতে, কেউ নির্মাণাধীন ভবনে, কেউ বা ট্রাকের মালামাল নামাতে চলে যান। আর যারা কাজ পান না, তারা কিছুটা হতাশ চোখে অপেক্ষা করেন পরদিনের নতুন ভোরের জন্য।
মাওনা চৌরাস্তা উড়াল সেতুর নিচের এই শ্রমের বাজার প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয়—শহরের উন্নয়ন, কৃষকের ফসল আর নির্মাণশিল্পের পেছনে নীরবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন একদল মানুষ, যাদের ঘামেই ঘুরছে জীবনের চাকা।