অনিয়মের আখড়া হয়ে উঠেছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ভূমি অফিস। ভূমির রেকর্ড জালিয়াতি, নামজারি, খতিয়ান ও ডিসিআর পেতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ঘুষ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের। সহকারী কমিশনার (ভূমি) থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত এই অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে তারা জানিয়েছেন।
ভূমি অফিসের এই ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কেরানীগঞ্জ উপজেলার সম্পাদক কাওসার আহমেদ।
ভুক্তভোগীরা জানাযন, টাকার জন্য কারণ ছাড়াই ভূমি অফিসে সেবা গ্রহীতাদের নামজারির আবেদন বাতিল, ভূমিসংক্রান্ত মিস কেসের রায় ঝুলিয়ে রাখা, বিভ্রান্তিকর রায় প্রদানসহ ব্যাপক অনিয়ম হয় ভূমি অফিসে। মডেল থানা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল মাওয়া, অফিসের কানুনগো শহিদুল ইসলাম, নামজারি সহকারী মাহফুজ বিশ্বাস ও নাজির শরীফ আহমেদ এবং তাদের দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়। নামজারি ফাইল জমা দিতে ঘুষ দেওয়া হয় দালালদের মাধ্যমে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নামজারি, নাম সংশোধন, অর্পিত সম্পত্তি, খাস সম্পত্তি অবমুক্ত হলেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়।
জিনজিরা ইউনিয়নের চর রঘুনাথপুরের জেসমিন নিলা নামে এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি ২০২৩ সালে সম্পত্তি খরিদ করেন। নামজারির আবেদন করলে ভুলে ৫ শতাংশ জমির জায়গায় ২ শতাংশ জমির নামজারি হয়। কিন্তু ডিসিআর না হওয়ায় তিনি আর খতিয়ান পাননি। সেই অসম্পূর্ণ নামজারি বাতিলের আবেদন দীর্ঘদিন শুনানির পর আদেশের তারিখ দেওয়া হলেও টাকা না পাওয়ায় এখনো আদেশ পাননি।
অপর ভুক্তভোগী কুশিয়ারবাগ গ্রামের প্রতিবন্ধী মো. সুমন, গোপপাড় মৌজার খরিদ সূত্রে মালিক থাকাবস্থায় পাগল হয়ে যান। তার মা নিরক্ষর এবং মানুষের বাসায় ঝিয়ের কাজ করেন। তাদের ৩ শতক জমি অন্য এক বক্তির নামে ভুলক্রমে নামজারি হয় । প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মিস কেস দায়ের করেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল মাওয়া টাকা না পাওয়ায় এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে জানান তার মা শাহানা বেগম।
মডেল থানার গদারবাগ এলাকার স্বপন বাড়ৈ আমার দেশকে বলেন, নামজারি অসম্পূর্ণ হওয়ায় তা বাতিলের জন্য মিস কেস আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আগের নামজারিতে তার নাম বহাল করা হোক। কিন্তু শুনানি শেষে আদেশ দিলেও ৩০ হাজার টাকা না দেওয়ায় আগের নামজারিতে নাম বহালের পরিবর্তে মূল খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার বিতর্কিত আদেশ দেন অ্যাসিল্যান্ড জান্নাতুল মাওয়া ।
নজরগঞ্জ এলাকার সবুজ মিয়া জানান, নামজারির আবেদন জমা দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার স্বীকার হন। নামজারির আবেদনের শুনানির দিন অফিসের কানুনগো ও অ্যাসিল্যান্ড জান্নাতুল মাওয়া তাদের লাঞ্ছিত করেন। প্রায় চার ঘণ্টা তাকে বিনা কারণে বসিয়ে রাখা হয়।
এছাড়া মডেল থানা ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে অর্থ না দেওয়ায় নামজারি বাতিল করা, লিজের সম্পত্তি কর আদায় না করা, নামজারিতে দালাল দিয়ে অর্থ আদায় ও অর্থের বিনিময়ে সরকারি সম্পত্তি লিজ দেওয়ার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে সুজনের কেরানীগঞ্জ উপজেলার সম্পাদক কাওসার আহম্মেদ বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল মাওয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ায় ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে সহকারী সচিব পরিচয়ে একজন ফোন দিয়ে তাকে হুমকিও দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ভূমি অফিসের কানুনগো শহিদুল ইসলাম, নামজারি সহকারী মাহফুজ বিশ্বাস ও নাজির শরীফ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে নামজারিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের অফিসে পাঁচ-সাতজন দালাল রয়েছে । তাদের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ ও অনিয়মের টাকা আদায় করা হয়।
এ ব্যাপারে মডেল থানা ভূমি অফিসের কানুনগো শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কাজ করলে অভিযোগ থাকবে। যে কারো অভিযোগ করার অধিকার আছে। দুর্নীতি-অনিয়ম সম্পর্কে তিনি কথা বলতে নারাজ। তিনি অ্যাসিল্যান্ড জান্নাতুল মাওয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন।
নামজারি সহকারী মাহফুজ বিশ্বাস বলেন, অ্যাসিল্যান্ডের নির্দেশনা ছাড়া কিছুই হয় না। কথা বলার থাকলে তার সঙ্গে বলেন।
ভূমি অফিসের নাজির শরীফ আহমেদ অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, আগে দুর্নীতি ও অনিয়ম ছিল। আমরা এখন স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছি। অফিস আগের মতো নেই। অ্যাসিল্যান্ডের নির্দেশে এখন কোনো দালাল অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ পায় না। এর পরও যদি অভিযোগ থাকে, অ্যাসিল্যান্ডকে বললে ব্যবস্থা নেবেন।
এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল মাওয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আমি মডেল থানা ভূমি অফিসে যোগদান করার পর অনিয়ম অনেক কমে গেছে।’ তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অভিযোগকারী বিভিন্ন সময়ে অফিস থেকে ইলিগ্যাল সুবিধা নিত, সেগুলো আমি বন্ধ করে দিয়েছি, তাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে।’
অফিসে কানুনগো, নামজারি সহকারী, নাজির ও দালালদের মাধ্যমে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে তিনি নিজে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেন।