বাধা দিতে গিয়ে বিপাকে স্থানীয়রা
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়নে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের বিরুদ্ধে নদীর চর দখল, প্রাকৃতিক বনায়ন উজাড়, শ্মশানঘাট দখল এবং ভূমিহীন হিন্দু পরিবার উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয়রা হয়রানি ও মামলার শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে জাইকার অর্থায়নে শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের কাজ করছে আর-রাদ করপোরেশন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সবুজ খান অতীতে তৎকালীন সরকারের এক প্রভাবশালী পানি সম্পদ মন্ত্রীর ভাগনে পরিচয় ব্যবহার করে খোলপেটুয়া নদীর চর দখলসহ কলবাড়ি ব্রিজসংলগ্ন প্রায় ৯০ একর জমি নামমাত্র মূল্যে লিজ নিয়ে চিংড়ি প্রকল্প গড়ে তোলেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খোলপেটুয়া নদীর তীরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা প্রায় তিন শতাধিক ছোট-বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গাছ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় নদীর ঢেউয়ের আঘাত থেকে বেড়িবাঁধকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিত। গাছ কাটার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে এবং উপকূলীয় বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৩ এপ্রিল রাতে সুন্দরবনসংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবাটি এলাকার চরে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে ফেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। একই রাতে তিনটি ভেকু নামিয়ে প্রায় ১৫ একর বিস্তীর্ণ চরে বেড়িবাঁধ আকারে রিংবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে নদীর সঙ্গে ওই অংশের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
খবর পেয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম। পরে তিনি বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন ঘটনাস্থলে গিয়ে রাতারাতি নির্মিত রিংবাঁধ অপসারণ করে পুনরায় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করেন। এরপর থেকে ওই অংশে বাঁধ সংস্কারের কাজ বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিকাশ মণ্ডল ও আব্দুল আজিজের অভিযোগ, বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ সংস্কার প্রকল্পের অংশ হিসেবে এর আগেও খোলপেটুয়া নদীর একটি চর দখল করে ব্লক নির্মাণের ইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে দুর্গাবাটি এলাকায় নতুন আরেকটি ব্লক নির্মাণ ইয়ার্ড তৈরির উদ্দেশ্যে চর দখলের চেষ্টা চলছে। এ সময় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
তাদের আরো অভিযোগ, চুনকুড়ি এলাকায় নদীর চরে বসবাসকারী ১৭টি ভূমিহীন হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং তাদের ব্যবহৃত শ্মশানঘাট দখল করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা মানববন্ধন করলে সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এসে ঠিকাদার সবুজ খান বাঁধ নির্মাণের চেয়ে নদীর চর ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি দখলে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। আমারও কিছু সম্পত্তি তিনি দখল করেছেন। এর প্রতিবাদ করায়, গত ২৫ মে আমার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে আর-রাদ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী সবুজ খান বলেন, সরকারের সব নির্দেশনা মেনে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়েই জায়গা ব্যবহার করেছি। চর দখল বা শ্মশান দখলের অভিযোগ সঠিক নয়।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান চাঁদা দাবি করছেন মর্মে ঠিকাদার আমাদের কাছে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা সেটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছি। সেখানে কোনো গাছ কাটা হয়নি। তবে গাছ কাটার ভিডিও থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, গাছগুলো ছোট ছিল।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি করছি। এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি ।