সমুদ্র উপকূলে অবহেলিত পড়ে থাকা এক প্রাকৃতিক সম্পদ লাল শৈবাল এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। দেশি সামুদ্রিক লাল শৈবাল ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যে প্রসাধনী ও পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য তৈরিতে প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)-এর একদল গবেষক। তাদের দীর্ঘ গবেষণার পর লাল শৈবাল থেকে ফেস সিরাম, টুথপেস্ট, কুকিজ ও বিভিন্ন পাই তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। উদ্ভাবিত এসব পণ্য বাজারে প্রচলিত কৃত্রিম পণ্যের একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে রয়েছেন ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা হক শিখা। তার সঙ্গে কাজ করছেন একই বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে Gracilaria প্রজাতির লাল শৈবাল পাওয়া যায়। গভীর সমুদ্রের এই উদ্ভিদে থাকা ‘ফাইকোএরিথ্রিন’ নামক রঞ্জকের কারণে এটি গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড, প্রোটিন, ফাইবার ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান। দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলজুড়ে এতদিন যা ছিল অবহেলিত ও অব্যবহৃত, সেই প্রাকৃতিক সম্পদ ‘লাল শৈবাল’ এখন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। এই শৈবালে উৎপাদিত উপাদান মানবস্বাস্থ্য ও ত্বক পরিচর্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড. ফাতেমা হক শিখা বলেন, সমুদ্রে সহজলভ্য লাল শৈবাল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় আমরা এটিকে খাদ্য ও ত্বক পরিচর্যায় ব্যবহারযোগ্য করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা দেশীয় ভাবে প্রাপ্ত শৈবালের নির্যাস থেকে ফেস সিরাম ও টুথপেষ্ট তৈরি করেছি। এই সিরাম অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিএজিং উপাদানে সমৃদ্ধ যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি, ব্রণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষত নিরাময়ে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া টুথপেস্টে আছে প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজ উপাদান। যা দাঁতের ক্ষয়রোধ, মাড়ির সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং মুখের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি কৃত্রিম কসমেটিক উপাদানের একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, একই শৈবাল ব্যবহার করে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য হিসেবে পাই ও কুকিজ তৈরি করা হয়েছে। এসব খাদ্যে প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকায় তা মানব দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণের সহায়ক হতে পারে। খাদ্য আঁশ হজমশক্তি উন্নত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য উন্নত করে। এছাড়া এটি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার অংশ হিসেবে শৈবাল নির্যাস সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুপাতে (৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ) শৈবাল নির্যাস ব্যবহার করে পণ্যের গুণগত মান ও কার্যকারিতা প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলাফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় ভবিষ্যতে এই পণ্যগুলো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্বল্পমূল্যের বিষয়টিও এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গবেষকরা জানান, যেহেতু শৈবাল সহজলভ্য এবং দেশীয়ভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব, তাই উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব। এতে সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসব পণ্য আনা যেতে পারে। বাজারে প্রচলিত কসমেটিক ও স্বাস্থ্যপণ্যের তুলনায় এটি একটি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বিকল্প হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
বিশ্বব্যাপী শৈবালভিত্তিক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পে লাল শৈবাল ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশে শৈবালভিত্তিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
তবে গবেষকরা বলছেন, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা ও সরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সঠিক পর্যবেক্ষণ ও সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে এই 'লাল শৈবাল' অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।