নেত্রকোনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর। পাহাড় ও টিলা অধ্যুষিত এই এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে কুল্লাগড়া ও সদর ইউনিয়নের পাহাড়ি অঞ্চলের হাজারো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গোপালপুর, ভবানীপুর, ফান্দা, বারমারী, ভরতপুর, গাজিকোনাসহ একাধিক পাহাড়ি গ্রামের মানুষ বাধ্য হয়ে পাহাড়ি ছড়ার ময়লা পানি পান করার জন্য সংগ্রহ করছেন।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সদর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের ৬১ বছর বয়সি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারী মিনতী হাজং। জীবনের প্রায় পুরো সময়ই তাকে পানি সংগ্রহের কষ্টে কাটাতে হয়েছে। প্রতিদিন পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়ায় গর্ত করে কয়েকবার পানি সংগ্রহ করে তার দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে হয়। মিনতী হাজং বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই পানি খেয়ে বড় হয়েছি। গোসল, খাওয়া—সবকিছুই এই পানি দিয়ে করতে হয়। পানির কষ্ট কোনোদিনই কমে না।’
শুধু তিনিই নন, সীমান্ত এলাকার অধিকাংশ গ্রামের মানুষের চিত্র একই। ছড়ার ময়লাযুক্ত পানি পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হলেও জীবন বাঁচাতে এই পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। দীর্ঘদিনেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বারোমারী গ্রামের বাসিন্দা অনন্ত কুমার হাজং প্রতিনিধিকে বলেন, ‘বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ ধরে আমরা এই ছড়ার পানি খাই। বালুর মধ্যে ছোট ছোট গর্ত করে কিছুটা পরিষ্কার পানি ওঠে, সেটাই পান করি। এতে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবুও বাঁচার জন্য খেতে হয়। সরকার আসে-যায়; অনেকবার আবেদন করেছি, কিন্তু এখনো সুপেয় পানির ব্যবস্থা হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ—আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।’
কাঞ্চন হাজং নামে আরেকজন বলেন, ‘আমরা পাহাড়ের উঁচু এলাকায় থাকি। দিনে কয়েকবার নিচে নেমে পানি এনে আবার উপরে ওঠা খুবই কষ্টকর।’
রাজিব হাজং জানান, ‘শুকনা মৌসুমে গর্ত করে পানি নেওয়া যায়, কিন্তু বর্ষায় পানি ঘোলা হয়ে যায়। তখন পানির সংকট আরো তীব্র হয়। আমরা চাই সরকার দ্রুত পানির ব্যবস্থা করুক।’
বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠনের সভাপতি পল্টন হাজং বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। বিশুদ্ধ পানির অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বাসিন্দারা।’ তিনি দ্রুত একটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে পাইপলাইনে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানান। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্গাপুর উপসহকারী প্রকৌশলী আলী আজগর জানান,‘ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের বসবাস। কিন্তু মাটির গভীরে পাথর থাকায় সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপন করা কঠিন। তবে এই সমস্যা সমাধানে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজা আফসানা বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। আশা করছি মানুষের দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট লাঘব হবে।’
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রতিবেদককে বলেন, ‘পাহাড়ের নিচে যারা থাকেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অর্থাৎ গারো-হাজং তাদের পানির সবচেয়ে বেশি সমস্যা। এরই মধ্যে আমি জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কথা বলে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার পাঁচটি ইউনিয়নের ৫২০ ফুটের ৪০টি গভীর নলকূপ বরাদ্দ দিয়েছি। যদিও অপ্রতুল তবুও আমরা শুরু করেছি; পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকটা এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।’