দখল-দূষণ আর পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযোগ না থাকায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে রাজশাহী জেলার ২১টি নদ-নদী। পাড় দখল ও দীর্ঘদিন খনন না করায় অধিকাংশই এখন মৃতপ্রায়। নদীর বুকে গড়ে তোলা হয়েছে বাড়ি, চাষ হচ্ছে ফসল। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব আর বর্ষাকালে নাব্য সংকটে নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে নিজস্ব রূপ। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিক দিবসের প্রাক্কালে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে রাজশাহীর নদী নিয়ে করা জরিপ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ ১৪ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস।
রাজশাহীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত এসব নদীর তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। বাদ যায়নি নদীর বুকও। দখলদারের তালিকায় রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। যার ফলে নদীগুলোর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।
নদী গবেষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর নারদ, সন্ধ্যা, স্বরমঙ্গলা, দয়া, বারাহী, হোজা, মুসা খাঁন, বারনই ও ফকিরনীসহ অধিকাংশ নদীর উৎসমুখ রাজশাহীতেই। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভারতের গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহারের ফলে পদ্মার এ শাখা-প্রশাখা নদীগুলো খরস্রোতা থেকে এখন খালে পরিণত হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে ১৯৮৫ সালে পদ্মার তীরে বুলনপুর থেকে তালাইমারী পর্যন্ত ১২টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। নদীগুলোর উৎসমুখেও এ গেট বসানো হয়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে নদীগুলোর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়। একসময় নদীর পরিচয়ই হারিয়ে যায়। নতুন প্রজন্ম জানে না, এসব এলাকায় এককালে নদী ছিল।
রাজশাহী মহানগরীর তালাইমারী এলাকায় ছিল স্বরমঙ্গলা নদীর উৎসমুখ। খরস্রোতা এ নদীটির পানি কাজলা-জামালপুর ও নামোভদ্রা হয়ে ললিতাহার, ভালুকপুকুর, রামচন্দ্রপুর হয়ে ফলিয়ার বিলে গিয়ে পতিত হতো। বর্তমানে নদী বলে এর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। একই অবস্থা বারাহী নদীরও। ফুদকিপাড়া মহল্লায় পদ্মা থেকে উৎপত্তি হলেও নদীটির প্রথম পাঁচ কিলোমিটার অংশ পুরোপুরি বিলীন। মোহনায় স্লুইসগেট নির্মাণ করে নদীর মৃত্যু ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
দয়া নদীর অবস্থাও শোচনীয়। স্বরমঙ্গলা থেকে জন্ম নেওয়া এ নদী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়াল বরাবর বয়ে যেত। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে নদীর রেখা থাকলেও তা পুকুরের আকার নিয়েছে। হোজা নদীর দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার এলাকা সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে গেছে। অথচ এ দমদমা এলাকা সুলতানি আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল এবং গাঙধোপাপাড়ার নামটি নদীরই পরিচয় বহন করে।
ঐতিহাসিক নদ নারদের তিনটি প্রবাহের একটি রাজশাহীতে। রাজশাহী শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শাহপুর গ্রামে পদ্মা থেকে এটির উৎপত্তি। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার প্রবাহ পথে এ নদীতে ছিল পাঁচটি নীলকুঠি। বর্তমানে এর উৎসমুখসহ প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশ বেদখল হয়ে ফসলি মাঠে পরিণত হয়েছে, গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। অবশিষ্টাংশ স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে দিঘিতে রূপান্তর করে মাছ চাষ করছে। নারদের শাখা সন্ধ্যা নদী ও মুসাখান নদীরও একই দশা। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে পানি তো দূরের কথা, নামমাত্র স্যাঁতসেঁতে ভাবও থাকে না।
নদীপাড়ের প্রবীণ ব্যক্তি আলাউদ্দিন, কায়ছার জামালসহ কয়েকজন জানান, বর্ষা মৌসুমে কিছু পানি এলেও সারা বছর নদীগুলো শুকনা থাকে। নদীর বুকে এখন আর নৌকা চলে না, চলে চাষাবাদ। বর্ষা শেষে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীর মাঝে বাঁধ দিয়ে শুরু করেন মাছচাষ। এতে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-বিলও শুকিয়ে যায়।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোসলেম উদ্দীন বলেন, ‘নদী থাকলে মানুষের মনে প্রভাব থাকে। এখন তো দেখি নদীগুলো মরে গেছে। এগুলো দখলমুক্ত করে খনন করা জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, নদীর অবৈধ দখল ও উচ্ছেদের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে জেলাপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ফোরামে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নদী গবেষক ও পরিবেশবিদ মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, রাজশাহী বিভাগের ৪৫টি নদীর মধ্যে ২১টি নদীই সংকটাপন্ন। দ্রুত সংরক্ষণ না করলে এগুলো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। নদী দখল ও দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনা ও রাবার ড্যাম তৈরি নদী হত্যার সামিল। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
এমন করুণ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং নদী রক্ষায় সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে ৬ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- পদ্মা নদী থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা নদী দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে, মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে, সকল শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ইটিপি বাধ্যতামূলক ও কঠোর মনিটরিং করতে হবে, বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গাসহ অন্যান্য নদী ও বিলের ড্রেন সংযোগ ও দূষণ বন্ধে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে, সাপমারার বিল, বারি বিল, ভূগরোইল বিলসহ সংশ্লিষ্ট সব বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফল প্রকাশ করতে হবে এবং নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যুব ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ নদীরক্ষা আন্দোলন রাজশাহীর সভাপতি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, বৃহত্তর রাজশাহীর অধিকাংশ নদীর প্রবাহ হুমকির মুখে। এর মধ্যে ২১ নদ-নদীর অবস্থা করুণ! এগুলো মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ক্ষমতাবান দুর্বৃত্তদের নদী দখল করে ভরাটের কারণেই মূলত এ পরিস্থিতি। এছাড়া দূষণ আর ফারাক্কার কারণে মূল নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকাও এসব নদীর অপমৃত্যুর অন্যতম কারণ। এখনো যদি দ্রুত দখলদারিত্ব মুক্ত করে এসব নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা যায়, তবে এগুলো বাঁচানো সম্ভব। যদি এটা করা না হয়, তাহলে এ অঞ্চলে জীব-বৈচিত্র্যে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। এসব নদী বাঁচাতে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নদী খনন, দখলমুক্ত এবং পানি সংরক্ষণ করতে না পারলে নতুন প্রজন্মকে নদীমাতৃক দেশের পরিচয় দেওয়া সম্ভব হবে না। এখনই উদ্যোগ না নিলে এসব নদী চিরতরে হারিয়ে যাবে।