রাতের ঘনকালো আঁধার কেটে ভোরের লালচে আভার আগমন, প্রভাতের বার্তা। ঘাসের ডগায় শিশিরের স্বচ্ছ জল। হিমশীতল স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে শোঁ শোঁ শব্দের মিতালি। নদীর উপর জমে থাকা কুয়াশাদল টুপটাপ করে পানি হয়ে ঢলে পড়ছে সরোবরে। পাখিদের ঘুম ভাঙতেই কিচিরমিচির আওয়াজে প্রার্থনা-আর্জির ধুম।
এরই মাঝে মৃদু শব্দে চপ্পলহীন চরণে হেঁটে চলেছে স্বপ্ন। তীব্র শীত তবুও দৈন্য থেকে স্বচ্ছতা প্রাপ্তির তরে তীব্র তাপ প্রবাহ অন্তরাত্মায়। শৈত্য প্রবাহকে নিবৃত করতে রং-বেরঙের পোশাকে আবৃত ১২-১৪ জন মায়েদের অনন্ত ছুটে চলা। তুলতে হবে মটর, বইট্টা, র্যায়। উপড়াতে হবে খেসারি, বুট মুটে মুটে। ভাঙতে হবে সবুজ-সবুজ লাউ-কুমড়ার শাক।
এভাবেই প্রভাবের আলোকসজ্জায় কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েন রাজশাহীর রাজপাড়া থানার ৭ নং ওয়ার্ডের শ্রীরামপুরের পারভীন-পলিরা। সোনা ঝরা রোদ্দুর ওঠে, উষ্ণতা ছড়ায় মহীতে কিন্তু পারভীন-পলিরা মহিত হয় ডালিতে ভরা শাক দেখে। এই শাক বিক্রি করে উপার্জন করবেন তারা ক’টি অর্থ। যা দিয়ে চলবে হান্ডি ঘরে আগুন, বাজার থেকে আসবে তেল-চাল-ডাল। বাচ্চারা যাবে স্কুলে, মুরব্বিরা পাবে ঔষধ।
শীতকালীন সময়ে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত রাজশাহী মহানগরীর সি অ্যান্ড বি মোড়ে ১৪জন উদ্যমী মায়েদের দেখা যায় শাকের ঢালা হাতে। ফুটপাতে পাটি পেড়ে বসেন তারা। কুচিকুচি করে কচি শাকগুলোকে কাটেন রান্নার উপযোগী করে। তুলে দেন ক্রেতার হাতে। শাকগুলো ঝামেলা ছাড়ায় অল্প সময়ে রান্না করে খেতে পারেন শাক প্রেমিরা।
প্রতি কেজি ভাতি (বইট্টা) শাক ৬০ টাকা, বুট শাক ১২০ টাকা, খেসারি শাক ১০০ টাকা, সরিষা শাক ৪০ টাকা, রায় শাক ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেন তারা। এছাড়া মেথি শাক ৩০ টাকা, মটর শাক ৩০ টাকা, সজনা শাক ২০-২৫ টাকা, লাউ শাক ৩০ টাকা, লাল শাক ২০ টাকা, সবুজ শাক ২০ টাকা দরে প্রতি আটি বিক্রি করেন।
সারাদিন শাক বেঁচে ১২’শত থেকে ১৫’শত টাকা ইনকাম করেন তারা। এরমধ্যে কোনো কোনো শাক কিনে আনতে হলে পরিশোধ করতে হয় সেটার মূল্য। পরিশোধ শেষে যা বাঁচে তাই দিয়ে চলছে তাদের দিন, তাদের সংসার।
সংগ্রামী এ যোদ্ধাদের একজন পলি খাতুন। সকাল ১০টার দিকে সি অ্যান্ড বি মোড়ে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের সামনে কুচিকুচি করে শাক কেটে বিক্রি করতে দেখা যায় তাকে। এ জগত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সবাই শ্রীরামপুরের মানুষ। ১৪ জন আছি যারা শাক বিক্রি করি এখানে। সকাল ভোরে উঠে গিয়ে শাক তুলে আনি। আমাদের বুনা শাক আছে, চরে হওয়া শাক তুলি, মাঝে মাঝে কিনেও আনতে হয়। সারাদিন বিক্রি করে রাতে বাড়িতে যায়। দিনশেষে যা থাকে দিনকাল ভালোভাবেই কেটে যায়।
আরেক শাক বিক্রেতা চল্লিশোর্ধ্ব বয়সী পারভীন বেগমের সাথেও কথা আমার দেশ প্রতিনিধির। জানান, দৈনিক ১২’শ থেকে ১৫’শ টাকার শাক বিক্রি করেন তারা। সংগ্রামে-সংকটে তারা আছেন বেশ। নদীর পাড়ের বাসিন্দা হওয়ায় শীতের তীব্রতায় যেমন কষ্ট পান, তেমন চরের মাঝে বেড়ে ওঠা শাকপাতা তাদেরকে সমৃদ্ধও করেন।
শাক কিনে ফিরছিলেন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, শীতকালে সারা বছর জুড়ে এখানে শাক পাওয়া যায়। শাকগুলো কুচিকুচি করে কেটে সুন্দরভাবে বিক্রি করে। ফলে কাটাকাটির ঝামেলা থাকে না। সহজেই নিয়ে গিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়। তাছাড়া তরতাজা বিষমুক্ত শাক খেতে মজাও দারুণ।