পীরগঞ্জের পিআইও আজিজের দুর্নীতি
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে টিআর প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। কাজ বাস্তবায়নে নয়ছয়ের পাশাপাশি ৫০ লাখ টাকার ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্প নিজের কবজায় রেখেছেন বলে জানা গেছে। তবে ওই প্রকল্পগুলোয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের শুধু কাগজে-কলমে সভাপতি করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প তদারকিতে যারা রয়েছেন তারাও অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে পিআইওর পক্ষেই কাজ করছেন।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) কাজের জন্য পীরগঞ্জের ১৫ ইউনিয়নে দুই কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এর বিপরীতে ৭২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে। এরপর পীরগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি নেন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের মেম্বারদের করা হলেও তারা শুধু প্রকল্পের বিল উত্তোলনের চেকে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
এই প্রকল্পগুলো (টিআর কাবিখা-কাবিটা) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পপি খাতুন ও রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার গোলাম কিবরিয়ার সঠিক তদারকি না থাকায় পিআইও আব্দুল আজিজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তদারকি কর্মকর্তারা পিআইওর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, এর আগে ওই পিআইও পীরগাছায় কর্মরত থাকা অবস্থায় তৎকালীন ইউএনও মো. নাজমুল হক সুমনকে ম্যানেজ করে অন্নদানগর ইউনিয়নের শল্লারবিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৬৬ টন গম আত্মসাৎ করেছেন। কাগজে-কলমে ওই প্রকল্পের সভাপতি হন ওই সময়ের একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম।
এ নিয়ে ২০২৪ সালে নভেম্বর মাসে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ‘৫৬৬ টন গম আত্মসাৎ চেয়ারম্যান-পিআইওর’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এ ঘটনায় একই বছরের নভেম্বরে আব্দুল আজিজকে বদলি করা হয় নীলফামারীর ডিমলায়। কিন্তু সেখানে এক মাস যেতে না যেতেই তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে আবারও পীরগঞ্জে আসেন।
এরপর তিনি ইউএনও ও ডিআরওকে ম্যানেজ করে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পিআইও অফিসে গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ বলেন, আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করি না, সব সময় ভালো থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু এখানে দুয়েকজন সাংবাদিক অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে আমার পেছনে লেগেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ আমার নিজে করার কোনো সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কারণে দুয়েকটি প্রকল্প এদিক-সেদিক হতে পারে। সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
প্রকল্পগুলো পরিদর্শনে গেলে পিআইওর স্বয়ং পরিচালিত ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। চতরা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য খোকন মিয়া বলেন, পিআইও স্যার আমাকে একটি প্রকল্পের সভাপতি করতে ছবি ও ভোটার আইডি কার্ড নিয়েছেন। এরপর তিনি তার অফিসের লোক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। শুধু বিল উত্তোলনের জন্য চেকে আমার সই নিয়েছেন।
কাবিলপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রীমা বেগমকে নিজ কাবিলপুর খিয়ারপাড়ার জিল্লুর বাড়ি থেকে বাদশার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার সলিংকরণ ও সংস্কার কাজের প্রকল্পের সভাপতি করা হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। তাকে শুধু প্রকল্পের সভাপতি করে তার কাছ থেকে বিল উত্তোলনের জন্য চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রীমা বেগম বলেন, আমি শুধু নামেই প্রকল্পের সভাপতি। পিআইও অফিসের কার্যসহকারী আতিক মিয়া এসে কাজটি তদারকি করে চলে যান।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প তালিকার ক্রমিক নম্বর ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৭, ৬৯, ৭০-সহ আরো কয়েকটি প্রকল্পের কাজ পিআইও পরোক্ষভাবে করছেন। এর মধ্যে ৬০ নম্বর ক্রমিকে শানেরহাট ইউনিয়নের পালানু সাহাপুর গুচ্ছগ্রাম ঠান্ডার বাড়ি থেকে গুছগ্রামগামী রাস্তার সলিং ও সংস্কারে দুই লাখ টাকা, পাঁচগাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে নাইয়াপাড়া পুরাতন জামে মসজিদগামী রাস্তা সংস্কার বাবদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ পায়।
এছাড়া এনায়েতপুর গ্রামের রাজ্জাকের বাড়ি থেকে বসন্তের বাড়িগামী রাস্তার সলিংয়ে দুই লাখ, জাহাঙ্গীরাবাদ রাখুর বাড়ি থেকে খাজা মিয়ার বাড়ি রাস্তা সলিং ও গাইডওয়াল নির্মাণ ও সংস্কার বাবদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা, মিঠিপুরের কাশিমপুর তাজুলের মেশিন ঘর থেকে আবু তাহেরের বাড়ির রাস্তার সলিং ও সংস্কারে তিন লাখ টাকা। রামনাথপুরের আব্দুল্লাপুর মোকছেদ মাস্টারের বাড়ি থেকে খন্দকারপাড়ার রাস্তা সংস্কার দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই কাজগুলো পিআইও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী দর্শন চন্দ্র, আতিক, ফরহাদ হোসেন তদারকি করছেন বলে জানা গেছে।
রায়পুর, রামনাথপুর, চতরা ও কাবিলপুর ইউনিয়নের কয়েকজন প্যানেল চেয়ারম্যান ও মেম্বার অভিযোগ করে বলেন, আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হলেও পিআইও আমাদের মূল্যায়ন না করে তিনিই জনপ্রতিনিধির মতো প্রকল্পের কাজ করছেন। এতে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পের কমিটি জমা হলে প্রকল্পের প্রথম কিস্তির অর্ধেক টাকা ছাড় দেওয়া হয়। এরপর প্রকল্পে কাজ বাস্তবায়ন হলে তা পিআইও এবং ইউএনও স্যার সরেজমিন ঘুরে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা ছাড় দেওয়ার কথা। কিন্তু ইউএনও পপি খাতুন পিআইওর কথায় অফিসে বসে চেকে স্বাক্ষর করেন। ওই চেয়ারম্যানের প্রশ্ন—ইউএনও অনৈতিক সুবিধা না পেলে তিনি কেন পিআইওর কথায় চেকে স্বাক্ষর করেন?
আরেক চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্প পরিদর্শনের নামে রংপুর থেকে ডিআরও গোলাম কিবরিয়া একটি সাদা গাড়িতে মাঝে মধ্যে এসে পিআইও অফিস থেকে উৎকোচ নিয়ে চলে যান।
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, পীরগঞ্জের পিআইও এবং ইউএনওর পাঠানো প্রকল্প তালিকা বিধি মোতাবেক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব ইউএনও এবং পিআইওর। কিন্তু পিআইও প্রকল্প নিজে বাস্তবায়ন করার কিংবা মেম্বারদের মাধ্যমে করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি তিনি এমন কাজ করে থাকেন, তা আমার জানা নেই।
তিনি বলেন, ওই পিআইওর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে, পিআইওর কাছ থেকে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গোলাম কিবরিয়া।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার পপি খাতুন জানান, চেয়ারম্যান মেম্বারদের যোগসাজশে পিআইও টিআর প্রকল্প নিজে বাস্তবায়ন করছেন কি না, এটা আমার জানা নেই। তবে আমি পিআইওর কাছ থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নিইনি। যদি কেউ আমার নামে এমন অভিযোগ করে থাকে, তা মিথ্যা।
বিষয়টি নিয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, আমি সম্প্রতি এ জেলায় যোগদান করেছি। বিষয়টি আপনার (সাংবাদিক) কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। অবশ্যই তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।