একসময়ের বিষবৃক্ষ তামাকের দখলে থাকা তিস্তা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন ছেয়ে গেছে সূর্যমুখীর হলুদ সমারোহে। লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের চরে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকেরা দেখছেন নতুন স্বপ্ন।
নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচর, যা একসময় ছিল ধূ-ধূ মরুভূমির মতো, এখন সারি সারি সূর্যমুখী ফুলে পরিণত হয়েছে ‘হলুদ গালিচায়’ মোড়া এক নয়নাভিরাম প্রান্তরে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন এই মনোরম দৃশ্য দেখতে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, তামাক চাষে অতিরিক্ত শ্রম, উচ্চ খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। বিপরীতে সূর্যমুখী চাষ তুলনামূলক সহজ ও লাভজনক।
প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে খরচ হয় মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, অথচ ফলন পাওয়া যায় ৬ থেকে ৭ মণ পর্যন্ত।
কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, “তামাক চাষে হাড়ভাঙা খাটুনি আর নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল। সূর্যমুখীতে খরচ কম, লাভ বেশি—তাই আমরা আশাবাদী।”
তামাকের আগ্রাসন রুখতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। উন্নতমানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ; কৃষকেরা দিয়েছেন জমি ও শ্রম।
মহিষখোঁচা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় জানান, “তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে লাভজনক বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী চাষ শুরু করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলন অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, বর্ষা শেষে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিশাল অনাবাদি চরাঞ্চলকে উৎপাদনের আওতায় আনাই ছিল মূল লক্ষ্য। সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে তামাকনির্ভরতা কমিয়ে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়দের মতে, তামাকের পরিবর্তে সূর্যমুখী প্রতিষ্ঠিত হলে একদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন বাড়বে। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে চরাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
তিস্তার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর এই সাফল্য শুধু কৃষকের ভাগ্য বদলের গল্প নয়—এটি টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্যসম্মত ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।