পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন, আলু চাষিদের হাহাকার
‘হামার কপালত আল্লায় কী থুইছে ভাই, গেলবারও দাম পাই নাই, এবার ফির আলুগুলা পানির নিচোত। এই ক্ষতি ক্যামন করি সইমো?’ অঝোরধারায় বৃষ্টির মধ্যে আবাদি জমির পাশে দাঁড়িয়ে এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন পীরগাছা পারুলের আলুচাষি নুরনবী মিয়া। তার মতো হাজারো কৃষকের স্বপ্ন এখন পানির নিচে। ২০২৫ সালের লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য বুকভরা আশা নিয়ে যারা আলুর চাষ করেছিলেন, ২০২৬-এর এই অকালবৃষ্টি তাদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ আলুর খেতে পানি জমে আছে। কৃষকেরা থালা-বাটি বা সেচ পাম্প দিয়ে পানি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বৃষ্টির দাপটে তা ব্যর্থ হচ্ছে। গত বছর উৎপাদন খরচ যেখানে ছিল কেজি প্রতি ১২-১৩ টাকা, সেখানে কৃষকেরা বিক্রি করেছেন মাত্র ৯-১০ টাকায়। সেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই এ বছর চড়া দামে বীজ ও সার কিনে নতুন করে আবাদ করেছিলেন তারা। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে সেই বিনিয়োগ এখন মাটির নিচে পচে যাওয়ার উপক্রম।
উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত দুই দিনের বৃষ্টিতে আমার তিন একর আলু পানিতে তলিয়ে গেছে। লেবার দিয়ে পানি নিষ্কাশন করতে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর ৩ একর জমিতে প্রায় ৬ লাখ টাকা লস করেছি, এবারও একই অবস্থা তার উপরে বৃষ্টি। এবার সরকার যদি আলু চাষিদের দিকে নজর না দেয় তাহলে মানুষ কৃষির উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
পারুল ইউনিয়নের আলুচাষি শামিম মিয়া, মোকসেদুল, সিরাজুল, রাসেল, আলম, রেজাউলসহ অনেকেই বলেন, গত বছরের ক্ষতি পুশিয়ে নিতে এবার লোন নিয়ে আলু চাষ করেছি, কেজি প্রতি ১২/১৩ টাকা খরচ অথচ বৃষ্টির কারণে আলু ৮ টাকা দাম করছে। আমাদের মরা ছাড়া আর কোন রাস্তা দেখছি না।
ছাওলা দক্ষিণ গাবুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আকরাম হোসেন বলেন, আফতাব উদ্দিন হাসিম মৌজায় পানিতে তলিয়ে গেছে আলু, এছাড়াও চর গাবুরা, রতনপুর, রামনিয়াশা, গোরাইপিয়া এলাকা মিলে প্রায় দেরশো একর জমির আলু বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাম্বুলপুর
ইটাকুমারি ইউনিয়নের মধুরাম গ্রামের মাসুদ রানা নামের এক কৃষক প্রায় সাড়ে ১৫ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি বলেন, এখন যদি আর বৃষ্টি না হয় এবং স্বাভাবিক রোধ হয় তাহলে প্রায় উৎপাদিত আলুর ২৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাম্বলপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দেবী গ্রামের কৃষক রনি বলেন, আলু উঠানোর পূর্ব মুহূর্তে বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কৃষকরা চরম বিপদে পড়েছি আমরা, এমনিতে আলুর দাম কম তার উপর আবার বৃষ্টির থাবা। এ অবস্থায় আলু উৎপাদনের খরচের অর্ধেকেরও বেশি উঠে আসবে না।
পীরগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আকস্মিক বৃষ্টির কারণে উপজেলার প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির আলু পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, তবে আলুর বয়স হওয়া ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমরা কৃষকদের দ্রুত আলু তোলার পরামর্শ দিচ্ছি। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।যাতে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে পীরগাছায় প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির আলু বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
তবে সরকারি এই 'প্রতিবেদন' এবং 'আশ্বাস' নিয়ে কৃষকদের মধ্যে রয়েছে চরম অবিশ্বাস। কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা না এসেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে প্রতিবেদন তৈরি করেন, যেখানে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।