রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা (মাউশি) অফিসে আলোচিত ঘুস কেলেঙ্কারির ঘটনা ধামাচাপা দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন উপপরিচালক (ডিডি) রোকসানা বেগম। ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ডিডি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি কথায় কথায় হুমকি দিচ্ছেন সাক্ষাৎ করতে আসা বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারীদের। সেই সঙ্গে তার কাজকর্মের একান্ত সহযোগী কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ কোটি টাকা আয়ের পাশাপাশি নিজ এলাকায় তিনতলা বাড়ি ও শহরে ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন।
ভুক্তভোগী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে আলোচিত ঘুস কেলেঙ্কারির ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অদৃশ্য ইশারায় এখনো উপপরিচালক রোকসানা বেগম এবং তার ব্যক্তিগত একান্ত সহকারী কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণে অফিসপাড়ায় তাদের অপকৌশল, স্বেচ্ছাচারিতা ও দৌরাত্ম্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগের সময় থেকে সুবিধাভোগী উপপরিচালক রোকসানা তার স্বামী নীলফামারী সরকারি কলেজের লেকচারার জাহেদুল ইসলামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের ম্যানেজ করে স্কুলশিক্ষক থেকে জেলা শিক্ষা অফিসার বনে যান। তিনি এখনো অফিসগুলোয় আওয়ামী লীগের দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন।
তারা আরো জানান, রোকসানা বেগম জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে প্রথমেই রংপুর জেলায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তিনি জেলা শিক্ষা অফিসকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আড্ডাখানায় পরিণত করেছিলেন। এরপর তিনি গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা অফিসার পদে বদলি হন। প্রথম থেকেই তিনি তার নিজস্ব কাজগুলো করার জন্য কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ আলীকে সঙ্গে রাখতেন। তিনি যেখানে বদলি হতেন, সেখানেই আশরাফ আলী সঙ্গী হতেন। তার ছত্রছায়ায় আশরাফ আলী নিজের ভাগ্য বদলে যা ইচ্ছা তাই করে চলেছেন। কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করে তিনি রংপুর নগরীতে ১৫ শতাংশ জমি, ফ্ল্যাট এবং গাইবান্ধায় নিজ এলাকায় আলিশান তিনতলা বাড়ি করে আয়েশি জীবনযাপন করছেন। তার চাল-চলন এবং আচার-আচরণে মনে হয় না তিনি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী।
রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোকসানা বেগম জেলা শিক্ষা অফিসে থাকাকালে আশরাফ তাকে বিভিন্ন পরামর্শ ও কৌশল শিখিয়ে দেন। এরপর ম্যাডাম (রোকসানা) আশরাফকে ছাড়া অফিসের কাউকে পাত্তা দিতেন না। এ কারণে সব কাজ তিনি আশরাফকে দিয়েই করাতেন। তিনি যখন গাইবান্ধায় বদলি হয়ে যান, সেখানেও আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে যান। পরে রংপুরের উপপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর আবার আশরাফকে নিয়ে আসেন। কারণ, এই আশরাফই তার সব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অফিসের সিনিয়র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের অফিসে এমপিও এবং শিক্ষকদের অন্য যেসব কাজ হয়ে থাকে, সেগুলো করার জন্য আশরাফের চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। কিন্তু উপপরিচালক রোকসানা ম্যাডাম আশরাফকে ছাড়া অন্য কাউকে তার কাছে ভিড়তে দেন না। তিনি যা করেন, আশরাফের মাধ্যমেই করেন। এ কারণেই এমপিও এবং অন্যান্য কাজে যারা আসেন, তারা সরাসরি অফিসে এসে আশরাফের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করেন। আশরাফকে না পেলে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসে এবং আশপাশে বসে থাকেন।
তিনি আরো বলেন, মাস দুয়েক আগে এই অফিসে ঘুস নিয়ে বড় ধরনের একটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী জেল খাটার পর বেরিয়ে এসে উপপরিচালক, তার গাড়িচালক এবং আশরাফকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সচিত্র সংবাদ প্রকাশ হয়। এর পরেও রোকসানা ম্যাডাম আশরাফকে ছাড়েননি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তদন্ত তো দূরের কথা, কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণেই এ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে কম্পিউটার অপারেটর আশরাফকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ম্যাডাম আমাকে যেভাবে কাজ করতে বলেন, আমি সে কাজগুলোই করি। যারা আমার বিরুদ্ধে লেগেছে, তারাই ভালো করে জানেন আমি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই। তবে বাড়ি ও সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে উপপরিচালক রোকসানা বেগম বলেন, আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করি না। বিধি মোতাবেক যে কাজটি করা সম্ভব, সেটাই আমি করি। শুধু আশরাফ কেন, অফিসে যারা আছেন সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন।
রংপুর মাউশির পরিচালক প্রফেসর আমির আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাকে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যা ভালো মনে করে তাই করবে। আমার কিছু বলার নেই।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ে সাত লাখ টাকা ঘুস দিতে এসে টাকাসহ আটক হন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম খান। এ নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি এবং ২ মার্চ আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশ হয়। অভিযুক্ত শিক্ষক মাইদুল ১৮ দিন হাজতবাস শেষে গত ১৬ মার্চ রংপুর নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন।
এ সময় মাইদুল ইসলাম বলেন, তার বাবা আব্দুর সবুর খানের দান করা এক একর জমিতে কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষক ও কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা আঞ্চলিক কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন। এক পর্যায়ে তার সঙ্গে উপপরিচালক রোকসানা বেগমের কথা হয়।
মাইদুলের দাবি, গত ডিসেম্বর মাসে কার্যালয়ের সিঁড়িতে উপপরিচালক রোকসানা বেগমের সঙ্গে তার কথা হয়। এ সময় প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য ছয় লাখ এবং কর্মচারীদের জন্য তিন লাখ টাকা করে দাবি করেন তিনি। পরে এক শিক্ষক ও তিন কর্মচারীর জন্য ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়।
মাইদুল ইসলামের অভিযোগ, টাকা জোগাড় করে ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি নির্দেশনা অনুযায়ী সাত লাখ টাকা একটি উপহারের প্যাকেটে করে এনে তার কার্যালয়ে অবস্থান করেন। তার ব্যাংক হিসাবে আরো এক লাখ টাকা ছিল। পরে দুপুরের দিকে রোকসানা বেগম তাকে অফিসে ডেকে কত টাকা এনেছেন জানতে চাইলে তিনি আট লাখ টাকার কথা বলেন। টাকা কম হওয়ার কারণে উপপরিচালক রোকসানা বেগম তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন।