মুকুলে ভরে গেছে গাছ
মুকুলে পরিপূর্ণ হয়ে ভরে গেছে হাড়িভাঙ্গা আমগাছ। মুকুলের মাঝে গুটি দেখে গত বছরের চেয়ে ভালো ফলনের আশা করছেন আম চাষিরা। তাই এ বছর থোকায় থোকায় মুকুল দেখে আমকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা। কৃষি বিভাগও বলছে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের চেয়ে দিগুণ আম বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কৃষি-বিভাগ থেকে আম চাষিদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না করার অভিযোগও আমচাষীদের।
রংপুরের সু-স্বাদু হাড়িভাঙ্গা আম ইতোমধ্যেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে আম চাষির সংখ্যা। জিয়াই পণ্য হিসেবে খ্যাত সুস্বাদু হাড়িভাঙ্গা আম রংপুর কৃষি অঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা এবং রংপুরসহ পাঁচটি জেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও বিরামপুর উপজেলাতেও ব্যাপকহারে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ করে রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলাকে ঘিরে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ বেশি হয়ে থাকে। এজন্য আমের সিজনে এই এলাকায় ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও থাকে বেশি।
বিভিন্ন বাগানে ঘুরে দেখা যায়, ছোট বড় প্রতিটি আম গাছে মুকুলে পরিপূর্ণ। হাড়িভাঙ্গা আমের পাশাপাশি আম্রপালি মিশ্রী ভোগ, গোপাল ভোগ সূর্যপুরীসহ নানান প্রজাতির আমের গাছের মুকুলে গুটিগুটি আম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গাছে পরিপূর্ণ মুকুল দেখে আমচাষী হীরা বেজায় খুশি। তারা খুশিমনে সবাই আম বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আম চাষিরা জানান, গতবছর যে আমগাছ গুলোতে একটিও মুকুল আসেনি সেই আমগাছটি এখন মুকিলে পরিপূর্ণ।থোকায় থোকায় মুকুলের ভরে ডাল পালা গুলো নিচের দিকে নেমে গেছে। অনেক গাছে এখনই খুঁটির উপর ভর করে রাখা লাগছে। যদি মুকুল অনুযায়ী এবার আম আসে সেক্ষেত্রে প্রতিটি আম গাছের ডালে নিচ থেকে বাঁশ অথবা কাঠের খুটি দিয়ে গাছের ডাল গুলো রক্ষা করতে হবে। তা না হলে মুকুলের ভরে গাছের ডালগুলো ভেঙ্গে পড়তে পারে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে এ বছর রংপুর জেলায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আমের বাগান রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন কৃষকের বাড়ির উঠোনসহ বিভিন্ন জমিতে অসংখ্য হাড়িভাঙ্গা আমের গাছ রয়েছে। আমের গাছের ডগায় ডগায় পরিপূর্ণ মুকুল এবং এখনই গুটি দেখে হাড়িভাঙ্গা আমে স্বপ্ন বুনছেন রংপুর অঞ্চলের আম চাষিরা।
বদরগঞ্জ উপজেলার ওসমানপুরের আমচাষী আলমগীর হোসেন বলেন, আমার ৪ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আমের বাগান রয়েছে। গত বছর আমের ফলন ভালো হয়নি।আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় গাছে মুকুল আসলেও গুটি কম হয়েছে। অনেক মেডিসিন দিয়েও আমরা পরিমাণ মতো আম উৎপাদন করতে পারিনি। তবে এ বছর প্রতিটি আম গাছে থোকায় থোকায় মুকুল এসেছে পাশাপাশি মুকুলে গুটি ধরা শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ আম উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে এ বছর ২০ লাখ টাকা মুনাফা করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
লোহানিপাড়ার আমচাষী জাহিদুল হক বলেন, সাড়ে ৬ একর জমিতে আমার হাড়িভাঙ্গাসহ অন্যান্য জাতের আম গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে গত বছরের চেয়ে মুকূলে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আবহাওয়া এখনো অনুকূলে নেই। বৃষ্টি না হয় আমরা নিজেরাই সেচ দিয়ে গাছগুলোকে তরতাজা রাখার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ থেকে আম চাষিদের কোন খোঁজ খবর বা সহায়তা দেওয়া হয় না। আমার এই ৬ একর জমিতে হাড়িভাঙ্গা সাদা আম কৃষা পাত ব্যানানা ম্যাংগো আম্রপালি গোপাল ভোগ ব্যানানা ম্যাংগো সহ ১১ প্রকারের আম রয়েছে।।
আশা করছি এ বছর সব খরচ বাদ দিয়ে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা ইনকাম করা সম্ভব হবে।
মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষী আব্দুল জব্বার আমার দেশকে বলেন, ছোট-বড় মিলে সাড়ে সাত হাজারের মতো আমের গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে এবার মুকুল এসেছে। মুকুল থেকে এখন আমের গুটিও দেখা যাচ্ছে অনেক গাছে। আমরা পানি শেষ থেকে শুরু করে আম রক্ষায় নানান ধরনের পরিচর্যা করছি। এবার যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে তাহলে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ উৎপাদন হবে। খরচ বাদ দিয়েও এবছর ৫০ লাখ টাকারও বেশি আয় করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
মুন্সি পাড়ার আমিনুল ইসলাম জানান আমাদের বাড়ির উঠোনে এবং আশেপাশের যে গাছগুলো রয়েছে গতবছরের তুলনায় এবার মুকুল এসেছে প্রতিটি গাছে। এখন পর্যন্ত মুকুলগুলো নষ্ট হয়নি। গত বছর বিভিন্ন রোগবালাই এবং কম মুকুল থাকায় তেমন আম লক্ষ্য করা যায়নি কিন্তু এবছর মুকুল গুলো অনেক লম্বা এবং পরিপূর্ণ এখনই গুটি গুটি আম লক্ষ্য করা যাচ্ছে আশা করি এবার গতবছরের তুলনায় এই গাছগুলোতে বেশি হবে
কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলা ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলকভাবে হাড়িভাঙ্গা আমের বাগানের সংখ্যা বেড়েছে এবং আমের প্রতিটি গাছে মুকুল বেশি এসেছে। এসব দেশি-বিদেশি নানান প্রজাতির আমের গাছগুলোতে পরিপূর্ণ মুকুল হয়ে গেছে। এবছর ছোট বড় মিলে কৃষক এবং বাণিজ্যিকভাবে আম চাষিদের প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আম চাষ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের মুকুলে গুটি আসা শুরু করেছে। আমরা আম চাষিদের নানান ধরনের পরামর্শ দিচ্ছি সে অনুযায়ী তারা পরিচর্যা করলে আমের ফলন দ্বিগুণ পাবে এবং কৃষকরা দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করতে পারবে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, এবছর হাড়িভাঙ্গাসহ দেশি বিদেশি প্রতিটি আম গাছে ডগায় ডগায় মুকুল এসেছে। সঠিক পরিচর্যা করলে এ বছর আম চাষিরা গত বছরের লোকসান গুণে এবার দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করতে পারবে। তবে কৃষকদের কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে সঠিকভাবে আমের কাজগুলো পরিচর্যা করার পরামর্শ দেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবছর বাণিজ্যিকভাবে ছাড়াও বিভিন্ন কৃষকের বাড়ি উঠুন মিলে প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ আম উৎপাদন হওয়া সম্ভব। আর কৃষকরাও গতবছরের তুলনায় অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারবে বলে তিনি জানানা।