মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও জুড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী, মুসলিম মনিপুরী ও বাঙালি নারীদের পরিচালিত তাঁত শিল্প ঈদ সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছে। মনিপুরী নারীদের তাঁতে বোনা শাড়ি, চাদর, গামছা, ওড়নাসহ বিভিন্ন বস্ত্র বাজারে বিক্রি হচ্ছে। যাচ্ছে বিদেশেও।
মনিপুরী তাঁত শিল্পের কাজ জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও জুড়িতে অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। পুঁজি ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে বর্তমানে মনিপুরী তাঁত শিল্পের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। বেড়েছে সুতার দামও, কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি কাপড়ের দাম। মনিপুরী সম্প্রদায়সহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে পড়া অতি প্রাচীন ঐতিহ্য এ তাঁত শিল্প হুমকির মুখে। মেশিনে তাঁতের শাড়ি বুনার কারণে নষ্ট হচ্ছে এর মান ও গুণ। ক্রেতা হচ্ছেন প্রতারিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পাওয়াতে মহাজনের ঋণের জন্য কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে কাপড়।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে বেড়েছে বিক্রিও। এ ঈদে শুধু কমলগঞ্জের তাঁতিরা ২০ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি করবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা নেতারা। মনিপুরী শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার পর বাজারে বেড়েছে এর চাহিদা।
আদমপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও গ্রামের মুসলিম মুনিপুরী তাঁত শিল্পী জুবেদা আক্তার জানান, শত কষ্টের মধ্যেও তাঁতের কাপড় বুনে চালান সংসার। এ তাঁত থেকেই তিনি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, কিনেছেন জমি। নিজের চিকিৎসার খরচসহ বহন করছেন নিজের পরিবারের খরচ। নিজের উপার্জনের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বাড়লেও শঙ্কা দাম নিয়ে। সরকারি সহযোগিতা বা ঋণ না পাওয়াতে
এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে আগাম দাদন নিয়ে পড়েছেন সমস্যায়। মহাজন তার ইচ্ছামাফিক দাম হাঁকাচ্ছেন। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁত শিল্পীরা। সরকারি ঋণ বা সহযোগিতার দাবি তাদের। শুধু জুবেদা আক্তার নয় অন্যরাও তাঁতে কাপড় বুনে হচ্ছেন লাভবান। অনেকে পড়ালেখার পাশাপাশি তাঁতে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে করছেন পরিবারকে সহযোগিতা। এ ঈদে বেড়েছে তাদের ব্যস্ততা। শিল্পী আক্তার পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করেন তাঁতে। এতে করে যা উপার্জন করেন তা থেকে নিজের পড়ালেখার খরচ চালানোর পাশাপাশি পিতা-মাতাকেও সহযোগিতা করেন।
কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, আলীনগর, মাধবপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে মনিপুরী সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রচুর। অন্যান্য ইউনিয়নে বিচ্ছিন্নভাবে মনিপুরীদের বসবাস রয়েছে। আগে সবগুলো বাড়িতেই মনিপুরীদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তাঁতের খটখট শব্দে পাড়া থাকতো মুখরিত। প্রথমে নিজেদের জন্য তাঁতের কাপড় বুনলেও এখন অনেকটা বাণিজ্যিক হয়ে মনিপুরী তাঁতের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানান অনেকে। মনিপুরীদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে গরিব বাঙালিদের মাঝেও মনিপুরী তাঁতের কাজটি ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে মনিপুরী আসল তাঁতের মান নষ্ট হচ্ছে বলেও জানান তারা। বেড়েছে সুতার দাম, তবে ঈদকে সামনে রেখে বেড়েছে সুতার বিক্রি।
মনিপুরী শাড়ি ও কাপড় ব্যবসায়ী শহীদ ও সাইফ উদ্দিন জানান, ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে মনিপুরী শাড়ি কাপড় ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে বেড়েছে তাদের বিক্রির পরিমাণ। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাপড় বিক্রি করছেন।
এ ঈদে শুধু কমলগঞ্জ এলাকা থেকে ২০ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হবে বলে জানান এ ব্যবসায়ী নেতা। তিনি আরো বলেন, অনেক জায়গায়ই মেশিনে মনিপুরী তাঁতের কাপড় বুনে বিক্রি করা হচ্ছেন, এতে করে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। কিন্তু প্রকৃত মনিপুরী শাড়ির বুনন হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও তাদের প্যাঠানও আলাদা। আর এ শাড়ি শুধু মনিপুরী তাঁত শিল্পীরাই তৈরি করে থাকেন, যার গুণগত মানও উন্নত। এ বছর ঈদে জেলায় শতকোটি টাকার মনিপুরী তাঁতের শাড়ি ও পণ্য বিক্রি হবে বলে জানান তাঁত শিল্পীরা।