দানবাক্সে মিলল আর্তনাদ ও ভালোবাসার চিরকুট
১৮ দিনের ব্যবধানে সিলেটের হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের দানবাক্সে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ২৫৩ টাকা পাওয়া গেছে। নগদ টাকার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা, রুপা ও সোনা-সদৃশ ধাতব বস্তুও জমা পড়েছে।
শনিবার দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে দানবাক্সের টাকা গণনা করা হয়। বিকেল ৬টায় গণনা শেষে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মাজার ব্যবস্থাপনায় গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এ তথ্য জানান।
টাকা-পয়সার পাশাপাশি এ কয়দিনে মাজারে একটি গরু ও ৬৫টি ছাগল দান করা হয়েছে। গরুটি নজরানা হিসেবে জবাই করে রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে। ছাগলের মধ্যে রান্না করা হয়েছে ৪০টি। বাকি ২৫টি বিক্রি করে দুই লাখ ২৫ হাজার ৪৫০ টাকা পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসন ও মাজার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, দানবাক্সে দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ১০৫ রিয়াল, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ ডলার, ভারতের দুই হাজার ৫৩২ রুপি, কাতারের ২২ দিরহাম, মালয়েশিয়ার ছয় রিঙ্গিত, হংকংয়ের ২০ ডলার, ২০ ইউরো, ওমানের এক দিনার ৪৫০ পয়সা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫৪ দশমিক ২০ দিরহাম, ইন্দোনেশিয়ার চার হাজার রুপিয়া, পাকিস্তানের ৬০ রুপি এবং সিঙ্গাপুরের ১০ ডলার।
এসবের পাশাপাশি দানবাক্সে ৯ গ্রাম সোনা, সোনা-সদৃশ ধাতব বস্তু ১০ গ্রাম এবং ৩৯ দশমিক ৪ গ্রাম রুপা পাওয়া গেছে।
এর আগে গত ২২ জুন প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মাজারের দানবাক্সের অর্থ গণনা করা হয়। ওইদিন ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়, যা সোনালী ব্যাংকে খোলা একটি বিশেষ হিসাবে জমা রাখা হয়। এর ১৮ দিন পর শনিবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে দানবাক্স খুলে অর্থ গণনা করা হলো।
দানবাক্সে মিলল আর্তনাদ ও ভালোবাসার চিরকুট
দানবাক্স খুলে এবার শুধু বিপুল পরিমাণ অর্থই নয়, পাওয়া গেছে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিচারপ্রত্যাশা, সামাজিক উদ্বেগ এবং ভালোবাসার আবেগে লেখা অসংখ্য চিরকুট। এসব চিরকুটের মধ্যে কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার জেলা প্রশাসন ও মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে মাজারের তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ এবং ছোট-বড় পাঁচটি দানবাক্স খুলে টাকা গণনার সময় নগদ অর্থের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন হাতে লেখা চিরকুট। এতে ব্যক্তিগত মানত, চাকরির প্রত্যাশা, পারিবারিক সুখ-শান্তির প্রার্থনা, দুর্নীতির অভিযোগ, বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত উঠে আসে।
সবচেয়ে আলোচিত চিরকুটগুলোর একটি লিখেছেন মোহাম্মদ জুবায়ের আহমদ নামে এক ব্যক্তি। তিনি তার বার্তায় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। চিরকুটে তিনি লেখেন যে, বার্তাটি তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে লিখেছেন বলেও উল্লেখ করেন। শেষাংশে ছিল ‘লাভ ইউ বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এমন দুটি বাক্য।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে আমিনুল নামের এক ব্যক্তির লেখা আরেকটি চিরকুট। সেখানে তিনি মহান আল্লাহর কাছে স্ত্রী মুন্নির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির অবসান, দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধি, আর্থিক সচ্ছলতা এবং শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করেন। চিরকুটে স্ত্রীকে ‘অনেক অনেক ভালোবাসি’ উল্লেখ করে তাদের সম্পর্ক আজীবন অটুট রাখার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেন।
চিরকুটটির ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই দম্পতির জন্য শুভকামনা ও দোয়া জানিয়েছেন। কেউ এটিকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ বলেছেন, আন্তরিক প্রার্থনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই একটি সংসারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া অন্যান্য চিরকুটে চাকরি পেলে খাসি দান করার মানত, মাজারের পশু কেনাবেচায় অনিয়মের অভিযোগ, কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগও উঠে এসেছে।
প্রতিবারের মতো এবারও দানবাক্সে পাওয়া অর্থ যেমন আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে, তেমনি মানুষের হাতে লেখা এসব চিরকুটও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। অর্থের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, বিচারপ্রত্যাশা, সামাজিক সংকট এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার বার্তাগুলো যেন মাজারের দানবাক্সকে মানুষের নীরব কণ্ঠস্বরের এক অনন্য দলিলে পরিণত করেছে।