দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকবদলে সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। সব আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। জাতীয় স্বার্থে আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর ক্যাম্পাস দখল, আধিপত্য বিস্তার ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং সংঘর্ষের কারণে বহুবার অস্থির হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সর্বশেষ জুলাই বিপ্লব দেশের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর অবস্থানকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
জানা যায়, ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় রাবির অন্তত ৩৩ শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ১৬ জন, ছাত্রলীগের সাতজন, ছাত্রদলের দুজন এবং প্রগতিশীল (বাম) সংগঠনের চারজন।
তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাবি ক্যাম্পাসে বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের হাওয়া। ক্যাম্পাসে এখন আর আগের মতো প্রকাশ্য সহিংসতা বা আধিপত্য বিস্তারের চিরচেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। কমেছে শোডাউন, মিছিল এবং হলের সিট দখল।
বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন সংঘাত ও পেশিশক্তির রাজনীতির বদলে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আগ্রহী। ছাত্রনেতারা মনে করেন, এখন সময় এসেছে অতীতের সহিংসতার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার।
বর্তমানে ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের রাজনীতির পরিবর্তে ছাত্র সংসদের (রাকসু) কার্যকারিতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মতো মৌলিক দাবিগুলো সামনে আসছে। ছাত্রসংগঠনগুলোর এই ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল আচরণ বজায় থাকলে রাবি একটি আদর্শ, স্থিতিশীল ও সহাবস্থানের শিক্ষাঙ্গন হবে বলে প্রত্যাশা ছাত্রনেতাদের।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাবি শাখার সদস্য সচিব ওয়াজিদ শিশির অভি বলেন, নব্বই দশকের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো পেটোয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে। এতে ছাত্ররাজনীতি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হারিয়ে ক্যাডারভিত্তিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়। চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা কিছুটা কমেছে। তবে অনেক সংগঠন এখনো ‘মাদার অর্গানাইজেশন’-নির্ভর।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের পর থেকে ক্যাম্পাস স্থিতিশীল রয়েছে। ভ্রাতৃত্বের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই।
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশুক চাকমা বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিবর্তন বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তবে এসব পরিবর্তন শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গঠনে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, চব্বিশের পর ক্যাম্পাসে কোরআন পোড়ানো, সরস্বতী পূজার ব্যানার ছেঁড়া, কাজলা গেটে দুই শিক্ষার্থীর ওপর হামলা ও অপহরণ এবং গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে একটি ‘ট্রানজিশনাল সময়’ চলছে এবং সময় অতিক্রান্ত হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট রাবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, নির্বাচনের পরও ইতিবাচক পরিস্থিতি বজায় আছে। অতীতের মতো সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব বা শোডাউনের রাজনীতি এখনো দেখা যায়নি। তবে ৩২ বছর পর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও চার মাসে দৃশ্যমান কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাও কমেছে।
রাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে যে সহাবস্থানের রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তা এখনো বজায় আছে। ফ্যাসিস্ট আমলের মতো হল বা সিট দখলের ঘটনা এখনো দেখা যায়নি। ছাত্র সংসদ কার্যকর রাখা এবং বড় সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখাই এখন একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস গড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
রাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, এতদিন বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে মজলুম ছিলাম। এবার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে সহাবস্থান নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পরও আমাদের আচরণে পরিবর্তন আসেনি। সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি বা শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কোনো অভিযোগও আমাদের বিরুদ্ধে নেই। আমার দৃষ্টিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাস অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। তবে একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর সংকট আমরা উপলব্ধি করছি।
রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় যে দখলদারিত্বের রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তার ও সহিংসতার সংস্কৃতি দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সে ধরনের রাজনীতির আর কোনো স্থান নেই। ক্যাম্পাসে যদি কেউ আবার দখল বা শক্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তা প্রতিহত করবে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার জায়গা। এখানে সহিংসতা নয়; বরং সহাবস্থান, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে আসছি। শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলা এবং একাডেমিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা আমাদের উদ্দেশ্য। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে সব ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।