হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্য হারিয়ে অস্তিত্বের সংকটে

ঢাকার রামমোহন রায় লাইব্রেরি

লিমন ইসলাম, জবি

দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে রাজধানীর শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার নীরব সাক্ষী পুরান ঢাকার রামমোহন রায় লাইব্রেরি আজ নিজেই ইতিহাস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায়। একসময় প্রতিদিন পাঠকের পদচারণে মুখর থাকা এই পাঠাগারে বইয়ের তাকে সাজানো ছিল ৩০ হাজারেরও বেশি দুর্লভ গ্রন্থ। সেই গৌরবময় অতীত এখন অনেকটাই ম্লান। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই পাঠাগারের সমৃদ্ধ সংগ্রহ কমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র কয়েকশ বইয়ে। জৌলুস হারিয়ে ঢাকার এই ঐতিহাসিক পাঠাগারটি এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।

তবুও গবেষণার প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখনো আসেন এই লাইব্রেরিতে। তবে আগের সেই পাঠকের ভিড়, জ্ঞানচর্চার প্রাণবন্ত পরিবেশ কিংবা সমৃদ্ধ সংগ্রহ কোনোটিই আর নেই। ভবনটির সংস্কার, দুর্লভ বই সংরক্ষণ এবং পাঠচর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ঢাকার শিক্ষা-সংস্কৃতির এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবলই অতীতের গল্প হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর পাটুয়াটুলীতে ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরের দ্বিতীয় তলার একটি ছোট্ট কক্ষে এখন সীমিত পরিসরে চলছে রামমোহন রায় লাইব্রেরির কার্যক্রম। কয়েকটি তাকে সাজানো প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বই। নিয়মিত পাঠকের উপস্থিতিও খুব কম।

অথচ এক সময় এই পাঠাগার ছিল জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, কাজী মোতাহার হোসেন, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, সুফিয়া কামাল ও শামসুর রাহমানসহ অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীর পদচারণে মুখর ছিল এই প্রাঙ্গণ।

একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লুট হয়ে গেছে হাজার হাজার মূল্যবান বই ও নথি। এরপর জরাজীর্ণ ভবন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও আইনি জটিলতায় এক সময়ের সমৃদ্ধ এই পাঠাগার আজ অস্তিত্ব সংকটে।

রাজা রামমোহনের স্মৃতিতে

বাংলার নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় স্মরণে ১৮৬৯ সালে এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক অভয় চন্দ্র দাশের উদ্যোগে পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির প্রাঙ্গণে এর যাত্রা শুরু।

১৯১০ সালে পৃথক ভবনে শুরু হয় পাঠাগারের কার্যক্রম। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণগ্রন্থাগারে পরিণত হয়। শুধু বই পড়ার জায়গা নয়—সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পায় রামমোহন রায় লাইব্রেরি।

এ পাঠাগারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য জগতের অনেক স্মরণীয় ঘটনা। ১৯৩০ সালে কবি জীবনানন্দ দাশ ও লাবণ্য গুপ্তের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই লাইব্রেরিতেই। পাঠাগারকে ঘিরে এমন ঘটনা বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী।

৩০ হাজার বই থেকে কয়েকশ

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে পাঠাগারটির সংগ্রহে ছিল ৩০ হাজারেরও বেশি বই। সেখানে সংরক্ষিত ছিল রাজা রামমোহন রায়ের গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ, বেদান্ত দর্শন এবং ফার্সি ভাষায় রচিত ‘তোফায়াতুল মোহাম্মাদিন’সহ বহু দুর্লভ গ্রন্থ।

সংগ্রহে ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম সংস্করণের রচনাবলি। গিরিশচন্দ্র সেন অনূদিত পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ এবং স্বাধীনতার-পূর্ববর্তী কয়েক দশকের সরকারি গেজেটসহ বহু মূল্যবান নথিও ছিল সেখানে।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর বদলে যায় সবকিছু। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার পর ব্রাহ্ম সমাজ ভবনে সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সে সময় পাঠাগারের হাজার হাজার মূল্যবান বই ও নথি লুট হয়ে যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, লুট হওয়া বইয়ের অনেকগুলো পরে কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এমনকি কিছু বইয়ের পাতা দোকানের ঠোঙা তৈরির কাজেও ব্যবহার করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর হারিয়ে যাওয়া বই ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একাধিকবার আহ্বান জানানো হলেও অধিকাংশ মূল্যবান সংগ্রহ আর ফিরে আসেনি। আজ সেই ৩০ হাজার বইয়ের পাঠাগারে রয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ বই। এর মধ্যে আছে ব্রাহ্ম ধর্মবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ, রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলি, মহাভারতসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ।

গবেষণার প্রয়োজনে আসেন শিক্ষার্থীরা

সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারটিতে এখন নিয়মিত পাঠকের উপস্থিতি খুবই কম। পুরোনো ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় মূল ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে সীমিত পরিসরে চলছে কার্যক্রম।

তবে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পাঠাগারে এখনো গবেষণা ও অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শফিক খান হাসিব একটি গবেষণাপত্র তৈরির কাজে সেখানে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা একটি রিসার্চ পেপার তৈরি করার জন্য এখানে এসেছি। প্রয়োজন ছাড়া পাঠাগারে আগের মতো শিক্ষার্থী আসেন না। এখানে বেশিরভাগ মানুষ আড্ডা দিতে আসে। পড়াশোনার যে গৌরবোজ্জ্বল পরিবেশের কথা শুনেছি, তার বিন্দুমাত্রও এখন চোখে পড়ে না।

বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য এ বি পাল বলেন, পাঠাগারটি সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণার কাজে এখানে আসেন। তবে পাঠাগার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও আশানুরূপ পাঠক পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি। পাঠাগারটির কার্যক্রম আরো বিস্তৃত পরিসরে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

জবির ইতিহাসের অংশ

রামমোহন রায় লাইব্রেরির ইতিহাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেকড়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ব্রাহ্ম সমাজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম স্কুল পরে জগন্নাথ স্কুল এবং পরে জগন্নাথ কলেজে রূপ নেয়। ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।

ফলে এই পাঠাগার শুধু একটি গ্রন্থাগার নয়; রাজধানীর আধুনিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কিন্তু সেই ইতিহাসের সাক্ষী ভবনটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ২০০৪ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। পরে ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। এরপর থেকে ভবনটির সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঠাগারটির কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।

মামলায় আটকে সংস্কার

পাঠাগারের সার্বিক দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল বলেন, বর্তমানে সাত সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে এক সময় এখানে যে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছিল, তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। পুরোনো ভবন-সংক্রান্ত মামলায় রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ যুক্ত থাকায় বিষয়টি জটিল হয়ে আছে বলে জানান তিনি।

রণবীর পাল বলেন, চলমান মামলার কারণে আমরা বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না। মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিও নেই। শুরুতে যে অবস্থায় ছিল, এখনো মূলত সে অবস্থাতেই রয়েছে।

নতুন ভবন নির্মাণ করে পাঠাগারের কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি জানান, এ মুহূর্তে বৃহৎ পরিসরে নতুন ভবন নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় বিবেচনার মধ্যে রয়েছে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা কান্ত রায় বলেন, এ লাইব্রেরিটি আমাদের প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক গভীর শিকড়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এমন একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দ্রুত ভবনটি যথাযথভাবে সংস্কারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে এই পাঠাগারের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে পাঠ্যপুস্তকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এর গুরুত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে রাবি

আ.লীগের ‘লকডাউন’ কর্মসূচির প্রতিবাদে জবি ছাত্রদলের বিক্ষোভ

বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ রাবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে

তখন স্পটে দেখলাম একটা শিয়াল ওর হাতে কামড়াচ্ছে: বললেন কুবি শিক্ষার্থী

অনুমতি পেলে অপ্রতিমকে কুবি ক্যাম্পাসে দাফন করা হবে

মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মারধর, হাসপাতালে মৃত্যু

জাবিকে আদর্শ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতার আশ্বাস

৭৮ পদ, শিক্ষক মাত্র ২১

ঢাবিতে মশার প্রজননস্থল খুঁজবেন শিক্ষার্থীরা

গুচ্ছভুক্ত ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা