রাইলস টিউব বসানোর সময় আমরা কি যথেষ্ট সতর্ক? রাইলস টিউব বসানোর আগে যে ভুলগুলো জীবন নিতে পারে। ব্যথা উপেক্ষা করলে ফল হতে পারে প্রাণঘাতী। এক্স-রে ছাড়া রাইলস টিউব : আমরা কতটা ঝুঁকি নিচ্ছি? একটি ভুল সিদ্ধান্ত, থেমে যেতে পারে একটি হৃৎপিণ্ড। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু প্রক্রিয়া আছে, যেগুলো আমরা এতটাই নিয়মিত করি যে সেগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকির কথা প্রায় ভুলেই যাই। রাইলস টিউব বা ন্যাজোগ্যাস্ট্রিক টিউব প্রবেশ করানো ঠিক তেমনই একটি ‘রুটিন’ পদ্ধতি। অথচ সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—
চিকিৎসায় রুটিন বলে কিছু নেই
Indian Journal of Surgery-তে প্রকাশিত কেরালার একটি কেস রিপোর্টে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। ৪৪ বছর বয়সি এক নারী রোগীর শরীরে রাইলস টিউব ভুল পথে প্রবেশ করে ঘাড়ের বড় শিরা ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন, সেখান থেকে সুপিরিয়র ভেনা কাভা হয়ে সরাসরি হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দ ভেদ করে পেরিকার্ডিয়ামে পৌঁছে যায়। এটি শুধু বিরল নয়—এটি সরাসরি প্রাণঘাতী।
কীভাবে এমন ভয়ংকর ঘটনা সম্ভব
রাইলস টিউব সাধারণত চোখে না দেখে, অর্থাৎ blind procedure হিসেবে প্রবেশ করানো হয়। গলার ক্রিকোফ্যারিঞ্জিয়াল জাংশন অংশটি শারীরবৃত্তীয়ভাবে সবচেয়ে সরু এবং তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সামান্য অতিরিক্ত চাপ, রোগীর প্রতিরোধ অথবা অস্বাভাবিক অ্যানাটমি থাকলে এখানেই ছিদ্র হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই কেসে রোগী নিজেই জানিয়েছেন, টিউব ঢোকানোর সময় তিনি তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, রক্ত বমি করেন এবং প্রবেশের পরপরই বুকে ও পিঠে অস্বস্তি শুরু হয়। এগুলো ছিল স্পষ্ট red flag—গুরুতর সতর্কসংকেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত কোনটি হতে পারত
চিকিৎসকদের মতে, এ ঘটনায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হতো যদি এক্স-রেতে টিউবের অস্বাভাবিক অবস্থান দেখে কেউ এটিকে ‘ভুল জায়গায় গেছে’ ভেবে সঙ্গে সঙ্গে টেনে বের করে দিতেন। সে ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ড থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ হয়ে কার্ডিয়াক ট্যাম্পোনেড তৈরি হতে পারত এবং মুহূর্তের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা ছিল।
এই রোগী বেঁচে গেছেন কারণ—
টিউবটি তাৎক্ষণিকভাবে না খুলে আগে সম্পূর্ণ সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে এর পথ নিশ্চিত করা হয় এবং পরে জরুরি কার্ডিয়াক সার্জারির মাধ্যমে নিরাপদভাবে অপসারণ করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ ঘটনার গুরুত্ব
আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রাইলস টিউব প্রায়ই ইন্টার্ন, ট্রেইনি ডাক্তার কিংবা নার্সিং স্টাফ দ্বারা বসানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে এখনো এক্স-রে ছাড়া টিউবের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। রোগীর ব্যথা বা অস্বস্তিকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে উপেক্ষা করার প্রবণতাও কম নয়। এই মানসিকতাই আসলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
এ ঘটনা কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—
১. ব্যথা বা প্রতিরোধ মানেই থামুন। জোর করে কোনো প্রক্রিয়া চালানো চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
২. সন্দেহ হলে এক্স-রে বাধ্যতামূলক। শুধু বাতাস ঢুকিয়ে শব্দ শোনা বা অভ্যাসের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
৩. অস্বাভাবিক পথে গেলে আগে বুঝুন, পরে খুলুন। না জেনে টিউব অপসারণ সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
৪. সিনিয়র তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। সাহায্য ডেকে নেওয়া দুর্বলতা নয়—এটাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
উপসংহার
এই কেসটি আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি—
‘First, do no harm.’
রাইলস টিউবের মতো একটি সাধারণ প্রক্রিয়াও যে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, তা আমাদের পেশাগত আত্মতুষ্টি ভাঙার জন্য যথেষ্ট। নিরাপত্তা, সতর্কতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতা—এই তিনটি ছাড়া চিকিৎসা কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি
সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল