নাক, কান ও গলা—এই তিনটি অঙ্গ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্বাস নেওয়া, কথা বলা, শোনা কিংবা খাবার গ্রহণ—সবকিছুই এগুলোর ওপর নির্ভরশীল। সামান্য অসচেতনতা কিংবা ভুল অভ্যাসের কারণে এসব অঙ্গে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ দেখা দিতে পারে। তবে কিছু সহজ ও সচেতন অভ্যাস গড়ে তুললে নাক-কান-গলার বহু সমস্যাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
১. কান পরিষ্কারে সতর্ক থাকুন
কটন বাড বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে কান খোঁচানো মোটেও নিরাপদ নয়। এতে কানের ভেতরে সংক্রমণ হতে পারে, এমনকি কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। প্রকৃতপক্ষে কানের ময়লা বা ওয়াক্স একটি প্রাকৃতিক ও উপকারী উপাদান, যা কানের ভেতরকে জীবাণু ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করে এবং স্বাভাবিক নিয়মেই ধীরে ধীরে বাইরে চলে আসে। গোসলের পর কেবল পরিষ্কার তোয়ালে বা নরম কাপড় দিয়ে কানের বাইরের অংশ মুছে নিলেই যথেষ্ট—ভেতরে কিছু ঢোকানোর প্রয়োজন নেই।
২. জোরে কথা বলা এড়িয়ে চলুন
দীর্ঘদিন জোরে কথা বলা বা চিৎকার করার ফলে কণ্ঠনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে ভোকাল কর্ডে নোডিউল বা পলিপ তৈরি হতে পারে, কণ্ঠস্বর ভেঙে যেতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও দেখা দেয়। পেশাগত কারণে যাদের বেশি কথা বলতে হয়, তাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি। কণ্ঠের যত্ন নিন।
৩. সুপারি, জর্দা ও গুল পরিহার করুন
সুপারি ও তামাকজাত দ্রব্য মুখগহ্বর ও গলার ক্যানসারের একটি প্রমাণিত কারণ। নিয়মিত সেবনে মুখ, জিহ্বা ও গলার মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার করাই সুস্থ থাকার প্রথম শর্ত।
৪. উচ্চ আওয়াজে হেডফোন ব্যবহার করবেন না
দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যায় এবং অকাল বধিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়। হেডফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে মনে রাখুন ৬০-৬০ রুল—ভলিউম ৬০ ডেসিবেলের বেশি নয় এবং একটানা ব্যবহার ৬০ মিনিটের বেশি নয়। এই নিয়ম মানলে কানের ক্ষতি থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা সম্ভব।
৫. ধূমপান বর্জন করুন
ধূমপান নাক-কান-গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। এটি কণ্ঠস্বর, শ্বাসনালি ও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। সুস্থ জীবনের জন্য ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা জরুরি।
৬. নাকের হাড় বাঁকা হলে করণীয়
অধিকাংশ মানুষের নাকের মাঝখানের হাড় কিছুটা বাঁকা থাকে বা নাকের ভেতরের মাংস (টার্বিনেট) সামান্য বড় হয়, যা অনেক সময় স্বাভাবিক। শ্বাস নিতে কষ্ট, ঘনঘন সাইনাস সংক্রমণ, দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকা বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো উপসর্গ না থাকলে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন নাকের ড্রপ ব্যবহার করাও ক্ষতিকর। এতে নাকের ভেতরের ঝিল্লি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৭. টনসিল ব্যথা হলেই অপারেশন নয়
টনসিলের সংক্রমণ বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যকবার না হলে এবং অপারেশনের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ না হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও সঠিক ওষুধে টনসিলের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে। ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলা এবং কুসুম গরম পানিতে গড়গড়া করলে অনেক সময় অপারেশন ছাড়াই উপকার পাওয়া যায়।
৮. কবিরাজি চিকিৎসা থেকে সাবধান
নাকের সমস্যায় অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ফলে নাকের ভেতরে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। নাকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, দুপাশ একসঙ্গে লেগে যাওয়া (সাইনেকিয়া), কিংবা নাকের মাঝের পর্দায় ছিদ্র তৈরি হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাকের ভেতরে অ্যাসিড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করা হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ‘অপারেশন ছাড়াই স্থায়ী সমাধান’—এ ধরনের প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন থেকে দূরে থাকুন।
৯. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নিন
বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক চুলকানোকে অবহেলা করবেন না। নাকের অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম মেনে চলা জরুরি। অ্যালার্জির সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ধূলাবালি, ঠান্ডা, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য এবং নির্দিষ্ট ঘ্রাণ (যেমন কয়েলের গন্ধ, সুগন্ধি বা বডি স্প্রে)। ব্যক্তিভেদে কারণ ভিন্ন হতে পারে।
১০. ঘাড়ে ফোলা বা চাকা হলে
গলা বা ঘাড়ের যেকোনো ফোলা বা চাকা ব্যথাহীন হলেও অবহেলা করা উচিত নয়। এটি লিম্ফ গ্রন্থির সংক্রমণ, গ্লান্ড টিবি, টিউমার কিংবা গলগণ্ডসহ বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে দেরি না করে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসাই সুস্থতার চাবিকাঠি। নাক-কান-গলার কোনো সমস্যা হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং ঠান্ডা পরিহার—এসব অভ্যাস নাক-কান-গলার সুস্থতায় সহায়ক।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা বিভাগ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট