মূত্রনালির রোগ, কিডনিতে পাথর কিংবা প্রোস্টেট সমস্যা কাদের ক্ষেত্রে বেশি হয়? এ বিষয়ে আজ আমরা হ্যালো ডাক্তার বিভাগে কথা বলব অধ্যাপক ডা. এম ফখরুল ইসলাম-এর সঙ্গে।
প্রশ্ন : বর্তমানে বাংলাদেশে কিডনি ও মূত্রনালির রোগ কেন এত দ্রুত বাড়ছে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর : আসলে বাংলাদেশে শুধু এই রোগ নয়, আমরা মনে করি সব রোগ বাড়ছে। মূলত এগুলো আগের তুলনায় ধরা পড়ছে বেশি—আগে এ সাবজেক্টের এত প্রাধান্য ছিল না, প্রসারতা ছিল না, স্পেশালিস্ট ছিল না। অতীতে এই রোগগুলোর ডায়াগনোসিস কম হতো। ডায়াগনস্টিক ইনস্ট্রুমেন্টেরও তখন এত আধিক্য ছিল না, কিন্তু রোগগুলোর প্রাদুর্ভাব ছিল। আগে ইউরোলজি বা নেফ্রোলজির কাছে ১০০ জন রোগী থেকে পাঁচজন রোগী রেফার করা হতো, বর্তমানে ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন রেফার করা হয়। ফলে আমরা দেখি, রোগের ডায়াগনোসিস আর রোগের সংখ্যা বাড়ছে; আসলে রোগের সংখ্যা বাড়ছে না।
প্রশ্ন : তরুণদের মধ্যেও কিডনিতে পাথরের সমস্যা বাড়ছে। এর পেছনে জীবনযাত্রার কী কী ভূমিকা রয়েছে?
উত্তর : আসলে কিডনিতে পাথর কিন্তু হয়ই তরুণদের। তরুণদের দুটো গ্রুপ—একটা হলো ইয়াং, একেবারেই যারা টিনএজার্স; আরেকটা হলো ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যান্ড অ্যাডাল্ট। একটা সময় ছিল যখন টিনএজার্সদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি ছিল না। যেসব মানুষ বাইরে কাজ করে, বিশেষত ২৫ থেকে ৪০ বা ৪৫ বছর বয়সের পুরুষ রোগীদের মধ্যে এটার আধিক্য বেশি হওয়ার কথা। কারণ এই শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে, তারা পানি কম খায়; শরীরের ভেতরে পানির চাহিদা যে পরিমাণ, তারা সে পরিমাণ খায় না। ফলে সেখানে ডিহাইড্রেশন হয়। ডিহাইড্রেশন হওয়ার পরে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। টিনএজারদের মধ্যে এ রোগ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো জাঙ্ক ফুড। দেশে ফাস্টফুডগুলো আসার পরিপ্রেক্ষিতে মেটাবলিক চেঞ্জ হয়, এটা একটি বিষয়। আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের যে সামাজিক কাঠামো, এই সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে একটি গ্রুপ গ্র্যাজুয়ালি ধনী হচ্ছে—বড় বড় শহরে মাইগ্রেট করছে। এ কারণে একটা উন্মুক্ত স্থানে ইয়াংরা দৌড়াদৌড়ি ও লাফালাফি করার স্পেসটা হারাচ্ছে। এই ছেলেমেয়েগুলো মোটাতাজা হয়ে যাচ্ছে, মনে হয় যেন একটু ফার্মের। এদের যে মেটাবলিক প্রবলেম, সেজন্য ইউরিক অ্যাসিড বাড়ে। ফলে ইউরিক অ্যাসিড স্টোন তাদের বেশি হয়। এছাড়া ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যান্ড অ্যাডাল্ট—এদের মধ্যে যে পরিমাণ ছিল, এখন সেই পরিমাণ বাড়ছে পর্যায়ক্রমে। এখানে একটি গ্রুপ ভিকটিম হয়ে যাচ্ছে, এই গ্রুপটা বিভিন্ন দেশে চাকরিবাকরি করতে যায়। বিশেষ করে এরা চাকরি করতে যায় মিড্ল ইস্টার্ন কান্ট্রিতে। তারা রাস্তায় কাজ করে, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কাজ করে, অন্যান্য জায়গায় কাজ করে। শরীরে পানির যে পরিমাণ সাপ্লাই তাদের থাকার কথা, সেই পরিমাণ পানি তারা কনজিউম করতে পারে না।
প্রশ্ন : প্রোস্টেট সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী এবং কোন বয়স থেকে নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত?
উত্তর : প্রোস্টেটের সমস্যাটা শুরু হয় ৪০ বছর বয়স থেকে। একটা পুরুষ যখন অ্যাডাল্ট হতে শুরু করে, তখন এটার কার্যকারিতা শুরু হয়। এটি এমন কিছু উপাদান তৈরি করে, যা আমাদের পুরুষের সিমেনের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এটার অ্যাক্টিভিটি বাড়ায়। নরমালি এটার ওজন হলো ১৮ থেকে ২০ গ্রাম। কিন্তু যখন বড় হতে হতে এমন কোনো পর্যায়ে যায়, দেখা যায় ৫০, ৬০, ৭০ বা ১০০ গ্রাম পর্যন্ত বড় হয়। এই প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হলে মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করে, ফলে প্রস্রাব নির্গত হওয়া কষ্টকর হয়। ৪০-পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের শরীরের হরমোন পরিবর্তিত হতে শুরু করে, ফলে আপনার প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি হয়; আর বৃদ্ধি হলে ইউরিন নির্গত হওয়া কষ্টকর হয়। এখানে কতগুলো বিষয় আলোচনা না করলেই নয়, ইয়াং থেকে ৪০ বা ৫০ বছর পর্যন্ত প্রোস্টেটের প্রধান রোগ হলো প্রোস্টাটাইটিস, অর্থাৎ প্রোস্টেটে প্রদাহ, ইনফেকশন। যেসব রোগীর ইউরিনে ইনফেকশন হয় ইয়াং বয়সে বিভিন্ন কারণে। সেটা পাথরজনিত কারণে হতে পারে, অপাথরজনিত কারণে হতে পারে, এমনকি সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজের কারণে হতে পারে, বা আপনার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের কারণে হতে পারে। সেটার কারণে ডায়াবেটিসের রোগীদের প্রোস্টেটের ভেতরে পুঁজ জমে যায়, যেটার নাম হলো প্রোস্ট্যাটিক অ্যাবসেস।
প্রশ্ন : বর্তমানে কিডনি স্টোন অপারেশনে লেজার প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর ও নিরাপদ?
উত্তর : লেজার পদ্ধতি অবশ্যই নিরাপদ। কিডনির ভেতরের পাথর ভাঙার জন্য এই প্রযুক্তি খুবই হেল্পফুল। বিশেষ করে ছোট ছোট পাথর ভাঙার জন্য লেজারটা খুবই ইফেক্টিভ। আর বড় পাথর যেগুলো, সেগুলো ভাঙার জন্য সবচেয়ে বেশি ইফেক্টিভ হলো আল্ট্রাসনিক ডিভাইস। ওটা দিয়ে বড় বড় স্ট্যাগহর্ন ক্যালকুলাসগুলো কিডনি ছিদ্র করে পিসিএনএলের মাধ্যমে আনার জন্য খুব সহজ হয়। লেজার প্রযুক্তি আসার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে আমরা পিত্তথলির পাথর, ইউরেটারের পাথর, কিডনির পাথর—এগুলো একবারে নিমিষেই ভেঙে শেষ করে দিতে পারি।
প্রশ্ন : শিশুদের ইউরিন ইনফেকশন বা জন্মগত ইউরোলজিক্যাল সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা কেন জরুরি?
উত্তর : শিশুরা তো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুতরাং তাদের ব্যাপারে যত্ন করা খুব জরুরি। শিশুদের ইউরোলজিক্যাল সমস্যাগুলো আল্ট্রাসনোগ্রাম আসার কারণে মায়ের পেটে থাকতেই ধরা পড়ে; যেমন কিডনির নালির ভেতরে সমস্যা, কিডনির ভেতরে সমস্যা—এগুলো কিন্তু ধরা পড়ে। কিডনি ফুলে যায়, যেটাকে আমরা বলি পিইউজে অবস্ট্রাকশন, ভিইউজে অবস্ট্রাকশনসহ অন্যান্য রোগ। এগুলো উন্নত বিশ্বে বা পার্শ্ববর্তী দেশে মায়ের পেটে থাকতেই চিকিৎসা করা যেতে পারে। এই রোগগুলো জন্মের পরপরই যত সম্ভব তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করার দরকার, তা না হলে কিডনি ড্যামেজ হয়।