হৃদযন্ত্র আমাদের শরীরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কর্মী এক মুহূর্তের জন্যও যার বিশ্রাম নেই। এই নিরলস কর্মযজ্ঞকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে চারটি ভালভ। এর মধ্যে মাইট্রাল ভালভ বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মধ্যে রক্তপ্রবাহের সঠিক দিক নিশ্চিত করে। কিন্তু যখন এই ভালভ ঠিকভাবে বন্ধ হতে ব্যর্থ হয়, তখন তৈরি হয় একটি নীরব অথচ মারাত্মক সমস্যা মাইট্রাল রিগারজিটেশন।
এ অবস্থায় হৃদযন্ত্র সংকুচিত হওয়ার সময় কিছু রক্ত উল্টোপথে অলিন্দে ফিরে যায়। শুরুতে রোগী হয়তো তেমন কিছু অনুভব করে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘উল্টো প্রবাহ’ হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, হার্ট ফেইলিউর, ফুসফুসে পানি জমা এবং অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের মতো জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে এটি রোগীর কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা ছিল ওপেন হার্ট সার্জারি। কিন্তু বাস্তবতা হলো সব রোগী এই সার্জারির জন্য উপযুক্ত নন। বিশেষ করে, বয়স্ক রোগী, কিডনি বা ফুসফুসের জটিলতা থাকা ব্যক্তি কিংবা গুরুতর হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের জন্য এই সার্জারি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতেন।
এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসেছে এক নতুন সম্ভাবনার নাম মাইট্রাল ভালভ ক্লিপিং, যার প্রযুক্তিগত নাম Transcatheter Edge-to-Edge Repair (TEER)। এই পদ্ধতিতে Abbott Laboratories-এর তৈরি MitraClip ডিভাইস বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এতে বুক কাটা লাগে না, হৃদযন্ত্র বন্ধ করতে হয় না এবং এটি একটি মিনিমালি ইনভেসিভ বা কম আঘাতজনিত প্রক্রিয়া। ঊরুর শিরা দিয়ে একটি সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে সেটিকে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর একটি বিশেষ ক্লিপের মাধ্যমে মাইট্রাল ভালভের দুটি পাতাকে কাছাকাছি এনে যুক্ত করা হয়, ফলে ভালভের ফাঁক কমে যায় এবং রক্তের উল্টো প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পুরো প্রক্রিয়াটি আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা হয়। ফলে রোগীরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। যেসব রোগী আগে সার্জারির ঝুঁকির কারণে চিকিৎসার বাইরে ছিলেন, তাদের জন্য এটি যেন নতুন জীবনের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এই পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত COAPT Trial-এ দেখা গেছে, উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি হার্ট ফেইলিউরের কারণে হাসপাতালে ভর্তি কমিয়েছে, মৃত্যুহার কমিয়েছে এবং রোগীদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে। এই ফলাফলের ভিত্তিতে American College of Cardiology এবং European Society of Cardiology-এর গাইডলাইনে এই পদ্ধতিকে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা বিকল্প হিসেবে Class IIa recommendation দেওয়া হয়েছে।
তবে সব রোগীর জন্য এই চিকিৎসা উপযোগী নয়। ভালভে অতিরিক্ত ক্যালসিফিকেশন, অত্যধিক প্রসারিত বাম নিলয় বা সক্রিয় সংক্রমণ থাকলে এই পদ্ধতি উপযুক্ত নাও হতে পারে। এ জন্য রোগীর বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অভিজ্ঞ কার্ডিওলজি টিমের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা