স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মেমোরি ফুল হয়ে গেলে আমরা ঝটপট অপ্রয়োজনীয় কিছু ছবি সিলেক্ট করে ‘ডিলিট’ করেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। আমরা ভাবি যে, মেমোরি একদম খালি হয়ে গেল! আমরা অনেক স্মৃতি, ঘটনা মস্তিষ্ক থেকে মুছে যায়, যা আর কখনো স্মরণ করতে পারি না। কিন্তু প্রযুক্তির দুনিয়ায় ‘ডিলিট’ শব্দটির অর্থ অনেক সময় আমাদের ধারণার চেয়ে ভিন্ন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ডিলিট করার পর ছবিগুলো আসলে যায় কোথায়? এগুলো কি চিরতরে বাতাসে মিলিয়ে যায়, নাকি ফোনের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে থাকে?
প্রথমত, ট্র্যাশ বা রিসাইকেল বিনের (Trash/Recycle Bin) কথা যদি আমরা বলি, কম্পিউটারে Recycle Bin বলি, অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে সেটাই গ্যালারির Trash বা * Recently Deleted ফোল্ডার হিসেবে থাকে। যখন আপনি কোনো ছবি প্রথমবার ডিলিট করেন, সেটি আসলে পুরোপুরি মুছে যায় না। এটি শুধু সাধারণ গ্যালারি থেকে সরে গিয়ে ট্র্যাশ ফোল্ডারে জমা হয়। সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত ছবিগুলো এখানে থাকে। যখন খুশি তখন ইচ্ছেমতো Trash or Recycle bin থেকে আবার ছবি বা ফাইল ফিরিয়ে (Restore) নেওয়া যায়। বর্তমানে অনেকেই ছবি সংরক্ষণের জন্য ক্লাউড সেবা ব্যবহার করেন, যেমনÑ Google Photos বা iCloud Photos।। দ্বিতীয়ত, ৩০ দিন বা ৬০ দিন পর Recycle Bin বা Trash থেকে এগুলো যায় কোথায়? আমরা চিন্তা করি, এবার আর হয়তো কখনো পাওয়া সম্ভব না। চিরতরে বুঝি হারিয়ে গেল! উত্তর হচ্ছে না, তাও না! কম্পিউটার বা ফোনের স্টোরেজ (Hard Drive বা SSD/Flash Memory) অনেকটা বিশাল এক আলমারির মতো। আর আপনার ছবি বা ফাইলগুলো হলো সেই আলমারির কাপড়। আলমারির শুরুতে একটা ‘ইনডেক্স’ বা ক্যাটালগ বা সূচিপত্র থাকে, যা দেখে বোঝা যায় কোন কাপড়টা কোন তাকে আছে। যখন আপনি কোনো ছবি পারমানেন্টলি ডিলিট করেন, অপারেটিং সিস্টেম মূল ছবিটি মুছে ফেলে না। সে শুধু ইনডেক্স থেকে ওই ছবির ঠিকানা বা ‘পয়েন্টার’ (Pointer) মুছে দেয়। টেকনিক্যাল ভাষায় একে বলা হয়ÑFile Allocation Table (FAT) বা NTFS/APFS সিস্টেম থেকে নাম কেটে দেওয়া। কম্পিউটার বা ফোনে এই ছবি বা ফাইলগুলো সবসময় বাইনারি কোড (০ ও ১) আকারে অবস্থান করে। ফোন তখন ধরে নেয় ওই ছবিটি আর নেই এবং ছবির নিচে থাকা মেমোরির জায়গাটিকে ‘ফ্রি’ বা ‘খালি’ (Available Space) বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ভেতরের আসল ডেটা (0 এবং 1-এর বাইনারি কোড) ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। তাহলে ছবিগুলো চিরতরে যখন মুছে যায়, তখন একে বলা হয় ‘ওভাররাইটিং’ (Overwriting)। যেহেতু ডিলিট করা ছবির জায়গাটিকে ফোন ‘খালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে, তাই আমরা যখন নতুন কোনো ছবি তুলি, নতুন গান ডাউনলোড করি বা কোনো অ্যাপ ইনস্টল করি, তখন ফোন ওই পুরোনো ছবির জায়গার ওপর নতুন ডেটা বসিয়ে দেয়। একবার পুরোনো ছবির ওপর নতুন ডেটা লেখা (Overwrite) হয়ে গেলে, সেই পুরোনো ছবি আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তখনই বলা যায় ছবিটি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। প্রশ্ন আসতে পারে, ডিলিট হওয়া ছবি কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? উত্তর হলোÑহ্যাঁ, সম্ভব!
যতক্ষণ না ডিলিট হওয়া জায়গার ওপর নতুন কোনো ফাইল জমা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন Data Recovery Software (যেমন : DiskDigger, Recuva বা Dr.Fone) ব্যবহার করে ওই লুকিয়ে থাকা বাইনারি ডেটা উদ্ধার করে ছবিটিকে আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব। একটা সুন্দর উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি হয়। মনে করুন, আপনার কাছে ৩৬৫ পৃষ্ঠার একটা মোটা ডায়েরি আছে। ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় একটি সূচিপত্র (Index) আছে, যেখানে লেখা আছেÑ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় আমার একটি ছবি আঠা দিয়ে লাগানো আছে। সাধারণ ডিলিট (Delete) : আপনি ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠার সূচিপত্র থেকে ওই লাইনটি কলম দিয়ে কেটে দিলেন। কিন্তু ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় গিয়ে ছবিটি ছিঁড়লেন না। এখন বাইরে থেকে কেউ সূচিপত্র দেখলে ভাববে ১০ নম্বর পৃষ্ঠাটি খালি। এটিই হলো সাধারণ ডিলিট। ছবি গ্যালারিতে দেখাবে না, কিন্তু মেমোরিতে থেকে যাবে। ওভাররাইট (Overwrite) : কিছুদিন পর আপনার ডায়েরিতে নতুন কিছু লেখার প্রয়োজন হলো। আপনি সূচিপত্র দেখে বুঝলেন ১০ নম্বর পৃষ্ঠাটি ‘খালি’ (যেহেতু আপনি সূচি থেকে কেটে দিয়েছিলেন)। আপনি ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় গেলেন এবং সেখানে থাকা ছবিটার ওপর আঠা দিয়ে নতুন একটি লেখার কাগজ চেপে বসিয়ে দিলেন। পুরোনো ছবিটি এবার চিরতরে ঢাকা পড়ে গেল। একেই বলে ওভাররাইটিং। এরপর আর ছবিটি উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো কিছুই সহজে হারিয়ে যায় না। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতাস্বরূপ ফোন বিক্রি বা কাউকে দেওয়ার আগে শুধু ‘ডিলিট’ করাই যথেষ্ট নয়। ফোনটিকে সম্পূর্ণ ‘Factory Reset’ করা উচিত, যাতে সব ডেটা এলোমেলো বা বিনষ্ট হয়ে যায় এবং কেউ আপনার ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য উদ্ধার করতে না পারে। বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন যে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের সুরক্ষা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ডিলিট করা ছবি যদি কোথাও ব্যাকআপ হিসেবে থেকে যায়, তবে তা ব্যবহারকারীর অজান্তেই সংরক্ষিত থাকতে পারে। তাই নিয়মিত ব্যাকআপ ব্যবস্থাপনা, ক্লাউড সেটিংস পর্যালোচনা এবং অপ্রয়োজনীয় ছবি স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার অভ্যাস ডিজিটাল নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।