পর্ব-০১
সপ্তম শতাব্দীর সূচনাকালে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে আরবে ইসলামের আবির্ভাব হয়। এর এক শতকের মধ্যেই ইসলামের ব্যাপ্তি বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মূলত অষ্টম শতাব্দীর শুরুর কালে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আরবের সেনাবাহিনীকে সিন্ধ ও মুলতান বিজয়ের জন্য পাঠান। এই বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন মুহাম্মদ ইবন কাসিম। এই অভিযানের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও এই বিজয় উপমহাদেশে মুসলমানদের স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তবে এর ফলে সিন্ধু উপত্যকার জনগণের ওপর ইসলামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে। তবে মুহাম্মদ ইবন কাসিমের এই জয়ের আলোড়ন উপমহাদেশের অভ্যন্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারেনি; বাংলার মতো পূর্ব দিকের অঞ্চলে এর প্রভাব ছিল খুবই কম। (Karim, Abdul, Social History of the Muslims in Bengal, p. -1)
বাংলায় মুসলিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে প্রায় পাঁচশ বছর সময় লেগেছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাকালে সেন রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজি বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকৃতপক্ষে, ঐতিহাসিক প্রমাণের স্বল্পতার কারণে বাংলায় ইসলামের আগমনের সুনির্দিষ্ট সাল নির্ধারণ করা কঠিন। অধিকাংশ আধুনিক ইতিহাসবিদ ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দকে বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের বছর হিসেবে বিবেচনা করেছেন। (Chowdhury, A. M., Dynastic History of Bengal, pp.-252-258.) আর অপ্রমাণিত লোককথা অনুসারে, রাজনৈতিক বিজয়ের আগেও কিছু মুসলিম সুফি-সন্ত বাংলায় আগমন করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগেই আরব বণিকরা উপমহাদেশে, বিশেষত বাংলায় দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং বাংলায় ইসলামের আগমনের দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন। বাংলায় ইসলামের আগমনের অর্থনৈতিক পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আমরা বাংলার সঙ্গে আরবের প্রাথমিক যোগাযোগের একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
নৌপথে বাংলার সঙ্গে আরব মুসলমানদের অর্থনৈতিক যোগাযোগ
সম্ভবত ২৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের অল্পকাল পরেই বাংলার সঙ্গে বণিকদের মাধ্যমে আরব বিশ্বের বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। মেসোপটেমিয়া সভ্যতার কালে ভারতের তুলা ‘সিন্ধু’ নামে পরিচিত ছিল এবং গ্রিসে গিয়ে তা ‘সিন্দুঁ’ রূপ ধারণ করেছিল। সম্পর্কের সূচনা থেকে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে উপমহাদেশের সঙ্গে গ্রিক-রোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্যের অবক্ষয়ের মধ্যবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। সেসব ঘটনা ইন্দো-আরব বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করে এবং এই বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পারসিকদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। ইসলামের উত্থানের পূর্ববর্তী শতকে আরব সাগরের বাণিজ্যে পারসিকরাই ছিল প্রভাবশালী। তাদের জাহাজ ভারতের বিভিন্ন বন্দরে নিয়মিত যাতায়াত করত। ভারতের সমুদ্রজাহাজ দজলা (টাইগ্রিস) নদীর মাধ্যমে মাদায়েনে পৌঁছাত। সে সময় বসরার নিকটবর্তী উবুল্লা শহরকে বলা হতো আরজুল হিন্দ, অর্থাৎ ভারতের সীমান্তভূমি। (Nizami, K. A., in the introduction of the Book “Arab Accounts of India” edited by Dr. Mohammad Zaki, (Delhi, 2009).) তবে ইসলামের আবির্ভাবের পর আরবরা আবার সমুদ্রবাণিজ্যের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
বাংলায় ইসলাম স্থল ও পানি উভয় পথেই প্রবেশ করে। বখতিয়ার খলজির বঙ্গ অভিযানের সময় তুর্কি বিজেতারা ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রথম আগমন করে; আর নদীপথে ইসলাম নিয়ে আসে আরব বণিকরা। তুর্কি বিজয়ের অনেক আগেই আরব মুসলমানরা বাংলা উপমহাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল মরুভূমি হওয়ায় সেখানে কৃষি-অনুকূল পরিবেশের অভাব ছিল; ফলে আদিকাল থেকেই আরব মুসলমানরা ছিল বাণিজ্যনির্ভর জাতি। তৎকালীন বিশ্বে তারা ছিল শ্রেষ্ঠ নাবিক ও সমুদ্রযাত্রী। পূর্ব এশীয় দেশসমূহ ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন জাতির সঙ্গে তাদের সমুদ্র বাণিজ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভূগোলবিদদের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, ইসলামের আবির্ভাবের আগেই আরব নাবিকেরা ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় সমুদ্রপথ ব্যবহার করে পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলমানরা আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সমুদ্রপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পশ্চিম ভূমধ্যসাগর তখন একপ্রকার মুসলিম ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা হ্রদে পরিণত হয়েছিল। (Pirenne, Henry, Mohammad and Charlemagne, (London, 1986), p. 285.)
দশম শতাব্দীতে সমুদ্রবাণিজ্যের রুটগুলোয় ছিল আরবদের একচেটিয়া আধিপত্য। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল এবং শ্রীলঙ্কাজুড়ে আরব বণিকদের বড় বড় বসতি গড়ে উঠেছিল; একই ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা দক্ষিণ চীন সাগর ও ফিলিপাইনের দ্বীপমালাতেও বিস্তৃত হয়। বাস্তবিকভাবেই এই বাণিজ্যপথে আরব বণিকদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই ব্যাপক ও প্রভাবশালী ছিল যে, ইউরোপীয়রা নিজেদের জন্য লাভজনক পথ বের করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। কেএ নিজামী এ বিষয়ে লিখেছেন, “উপমহাদেশের সঙ্গে আরব বিশ্বের সম্পর্ক সুদূর অতীতে প্রোথিত। ইসলামের উত্থানের অনেক আগে থেকেই ভারত ও আরবের মধ্যে প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল এবং আরব বণিকরা মিসর ও সিরিয়ার মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করত। এলফিনস্টোন যথার্থই মন্তব্য করেছেন, জোসেফের যুগ থেকে শুরু করে মার্কো পোলো ও ভাস্কো দা গামার সময় পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্তা ছিল আরবরাই। ভারতের পশ্চিম উপকূলে বিপুলসংখ্যক আরব উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, আর আরব দেশগুলোয়ও বহু ভারতীয় বসতি প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ইসলামের বিস্তার এবং আরবদের ইসলাম গ্রহণের পরও এই উপনিবেশগুলো আগের মতোই বিকশিত হতে থাকে। ভারতের রাজারা নিজেদের রাজ্যে মুসলিম বিচারক নিয়োগ করতেন, যারা hunurman নামে পরিচিত ছিল। তারা মুসলমানদের বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং তাদের সামষ্টিক জীবন সংগঠনের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো। বাণিজ্যিক যোগাযোগ সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও জন্ম দেয়; ফলে বহু আরবি নৌ-পরিভাষা ও অন্যান্য শব্দ ভারতীয়রা গ্রহণ করে, আর ভারতের রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও আচরণপদ্ধতি আরবেও প্রবেশ করে। ভাষাতাত্ত্বিকরা কোরআনে ব্যবহৃত তিনটি সংস্কৃতমূল শব্দের সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলো হলো—মেশক (Musk), জানবিল (ginger) এবং কাফুর (camphor)। (Nizami, K. A., প্রাগুক্ত।)
এভাবে বাংলাসহ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সুদূর প্রাচ্যের চীনে বাণিজ্য যাত্রার পথে এই উপমহাদেশের বন্দর সমূহ মধ্যবর্তী স্থানে পড়তো। তাই, আরব বণিকরা সেখানে বিশ্রামের জন্য থামতো এবং সেখানে অবস্থান করত। ধীরে ধীরে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলা, বার্মা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত সমগ্র দক্ষিণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বিস্তৃত লাভ করে। ফলে ভারত ও বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের এক সংযোগ ভূমিতে পরিণত হয়। (See Hourani, George Faldo, Arab Seafaring in the Indian Ocean in Ancient and Medieval Times, (Princeton University Press, 1951)।) ইতিহাসে এটা স্বীকৃত যে, সিলন থেকে আগত আরবের জাহাজ বহরে সিন্ধুর দেবল উপকূলে জলদস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়। এর প্রেক্ষিতে ৭১২ সনে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে শুধু আরবদের নৌযোগাযোগ নিরাপদ হয়নি, বরং সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নতুন গতি ও প্রেরণা লাভ করে।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলার সঙ্গে আরবদের প্রাথমিক যোগাযোগ সম্পর্কে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে আরব ভূগোলবিদদের রচনায় পরোক্ষ কিছু বিবরণ পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে সাধারণভাবে পূর্বভারত এবং বিশেষভাবে বাংলার কয়েকটি স্থান শনাক্ত করা যায়। এ প্রসঙ্গে সুলাইমান তার ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে লিখেছেন—
‘এই তিনটি রাষ্ট্রের সীমানা Ruhmi (রুহমি) নামে পরিচিত এক রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এই রাজ্যটি গুর্জর-প্রতিহার রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। এই রাজার মর্যাদা খুব উচ্চ বলে বিবেচিত নয়। তিনি যেমন বালহারার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তেমনি গুর্জর রাজার সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িত। তার সৈন্যসংখ্যা বালহারা, গুর্জর বা তফকের রাজার তুলনায় অধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, তিনি যখন যুদ্ধে অভিযানে বের হন, তখন তার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার হাতি থাকে।
তার সৈন্যবাহিনীতে দশ থেকে পনেরো হাজার লোক রয়েছে, যাদের দায়িত্ব কাপড় ধোয়া ও তা প্রক্রিয়াজাত করা। তার দেশে এমন এক বিশেষ প্রকারের বস্ত্র প্রস্তুত হয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বস্ত্রটি এত সূক্ষ্ম ও কোমল যে, সেই বস্ত্রের তৈরি পোশাক একটি আংটির ছিদ্র দিয়েও অনায়াসে পার করা যায়। এটি তুলা থেকে প্রস্তুত, এবং আমরা এর একটি নমুনা দেখেছি। সেখানে কাউরি শাঁসের মাধ্যমে বাণিজ্য ও লেনদেন পরিচালিত হয়; এটা সেই দেশের প্রচলিত মুদ্রা। তাদের দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্যও বিদ্যমান।’ ( Elliot and Dowson, History of India as told by its own Historians, vol. 1, (London, 1867), p.-5.)
মূল : প্রফেসর ড. তাওহিদুল ইসলাম
অনুবাদ : আনিকা মাহমুদ