শাবান মাসের চতুর্দশ দিবসে পালিত মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হলো শবেবরাত। ইসলামের ইতিহাসে নববি যুগ থেকেই এ রাতের তাৎপর্য আলোচিত হয়ে আসছে। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমত লাভের সুসংবাদও এ রাতকে ঘিরে বর্ণিত হয়েছে। দুই ঈদের পর এটি বাংলার মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
উপমহাদেশে শবেবরাত
নবীজি (সা.)-এর সময়কাল এবং তার পরবর্তী সময়ে আরব থেকে ইসলাম প্রচারে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যারা সফর করেছেন, তাদের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে শবেবরাত পালনের আনুষ্ঠানিকতা ছড়িয়ে পড়ে। তখন এই আনুষ্ঠানিকতাকে উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে ধীরে ধীরে এই দিনে ভালো খাবার তৈরি ও খাবার বিতরণের মাধ্যমে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার প্রথা তৈরি হয়।
বাংলা পাক-ভারত উপমহাদেশে শবেবরাত পালনের প্রচলন কবে থেকে শুরু হলো সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা যায়, ইসলামের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে শবেবরাতেরও আগমন ঘটেছিল। উপমহাদেশের মুসলমানরা আনন্দ উৎসবের সঙ্গে এই দিনটি অতিবাহিত করে। এই উপলক্ষে তারা বহু আচার-অনুষ্ঠান ও আমোদ-স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদযাপন করে। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল।
১৩ শতকে দিল্লির সুলতানদের শবেবরাত পালনের বিভিন্ন বিবরণ ইতিহাসের গ্রন্থাদিতে পাওয়া যায়। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ‘সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (শবেবরাত উপলক্ষে) চার দিনব্যাপী উৎসব উদযাপন করতেন এবং এত বেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাতের বেলায়ও দিনের মতো আলোকিত হয়ে যেত।
ইরানের ইয়াজদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অধ্যাপক মোহসেন সাইদি মাদানি তার ‘ইমপ্যাক্ট অব হিন্দু কালচার অন মুসলিমস’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে শবেবরাতে হালুয়া-রুটি তৈরি ও বিতরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।’
সমসাময়িক বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, ‘শের শাহর একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিশতির সঙ্গে শবেবারাতে সারারাত ইবাদত-বন্দেগি করতেন।
মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরও এই দিনটি বিশেষভাবে উদযাপন করতেন। মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তানে গায়েবি’তে শবেবরাত উদযাপনের বিবরণ পাওয়া যায়।
পুরোনো দিনে পুরান ঢাকায় শবেবরাত
আদি ঢাকার অধিবাসীরা দুই ঈদের চাঁদরাতের মতো শবেবরাতও বিশেষ উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করতেন। এ রাতে আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুলের প্রত্যাশায় মুসলমানরা গভীর ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকতেন। পুরান ঢাকায় শবেবরাত উপলক্ষে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও রাত জেগে ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে দেখা যেত।
ফলে রাতব্যাপী তসবিহ পাঠ, নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত ও খতম, দরুদ শরিফ পাঠ প্রভৃতিতে প্রায় প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা মশগুল থাকতেন। সন্ধ্যার পর শিশুদের তারাবাতি নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠাও ছিল এ রাতের একটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। অনেক পরিবার ঘরবাড়িতে মোমবাতি ও আগরবাতি প্রজ্বালন করতেন। বর্তমান সময়েও শবেবরাত উপলক্ষে পাড়া-মহল্লায় তারাবাতি, মোমবাতি ও আগরবাতির বিক্রিতে লক্ষণীয় বৃদ্ধি দেখা যায়।
শবেবরাতে মসজিদগুলোয় সারারাত ইবাদত-বন্দেগি শেষে মুসল্লিরা ফজরের নামাজ আদায় করে নিজ নিজ বাসায় ফিরে যেতেন। মধ্যরাতেও মানুষের চলাচলে পুরান ঢাকার রাস্তাঘাট দিনের মতো মুখর থাকত। এর ফলে গভীর রাত পর্যন্ত খাবারের দোকানপাট খোলা থাকতে দেখা যেত। এখনো এ উপলক্ষে বৃহদাকারের বিশেষ রুটি বিক্রির প্রচলন রয়েছে। পাশাপাশি পরদিন রোজা পালনকারী মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইফতারসামগ্রীও পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতে দেখা যায়। শবেবরাত উপলক্ষে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অস্থায়ীভাবে শামিয়ানা টাঙিয়ে নানা পদের ও বিভিন্ন আকৃতির রুটি বিক্রির দৃশ্য একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ দিনেই বৃহৎ আকারের বিশেষ রুটি প্রস্তুত ও বিক্রির প্রচলন সর্বাধিক লক্ষ করা যায়।
শবেবরাতে উপলক্ষে বছরের একমাত্র এই দিনে পুরান ঢাকায় নানা ধরনের বিশেষ রুটি এবং হালুয়া প্রস্তুত ও বিক্রি করা হতো। এ সময় বাজারে বিভিন্ন সাইজের গোল রুটি, ছোট আয়নায় সাজানো রুটি, রঙিন পুঁতিমালা দ্বারা সজ্জিত রুটি, কুমির, মাছসহ বিভিন্ন আকৃতির রুটি বিক্রি হতো। এছাড়া প্রচলিত বানরুটি প্রস্তুত থাকত। প্রতিটি পরিবারের ঘরে নানা পদের হালুয়া তৈরি হতো, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল বুটের ডাল ও সুজির হালুয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দোকানগুলোয় আরো বিভিন্ন ধরনের হালুয়ার দেখা পাওয়া যায়।
শবেবরাত উপলক্ষে অধিকাংশ বাড়িতে পোলাও-বিরিয়ানি রান্নার আয়োজন থাকত। সারারাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকার জন্য মসজিদগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা দেখা যেত। ফজরের নামাজের পর মসজিদগুলোয় তবারক হিসেবে তেহারি বিতরণ করা হতো, যা বর্তমান সময়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ সময় হালুয়া-রুটি তৈরির উপকরণ ও মাংসের দোকানগুলোয় অনেক বেশি ব্যস্ততা লক্ষ করা যেত। এখনো আবুল হাসনাত রোড, রায়সাহেব বাজার, নারিন্দা, লালবাগ, লক্ষ্মীবাজার, দয়াগঞ্জ, কসাইটুলি, আরমানিটোলা, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, নাজিরাবাজার ইত্যাদি স্থানে বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী বিশাল শিরমাল রুটি বিক্রি করতে দেখা যায়।
শবেবরাতে শিশুরা পাঞ্জাবি ও টুপি পরে বড়দের সঙ্গে মসজিদে যেত। এছাড়া ঘরে তৈরি চালের রুটি, বানরুটি ও হালুয়ার সাজানো ডালা নিয়ে ঘরে ঘরে বিতরণ করত। বর্ণিল পুরান ঢাকার শবেবরাত শুধু একটি ধর্মীয় রাতই ছিল না; এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও একতার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত হতো।
শবেবরাতের রাতে কিশোর-কিশোরীরা আনন্দ প্রকাশের জন্য পটকা ও আতশবাজি ব্যবহার করত, যা উৎসবমুখর পরিবেশকে আরো উজ্জ্বল করে তুলত। পুরান ঢাকার শবেবরাতের সব আয়োজন মূলত চকবাজারকে কেন্দ্র করে হতো। চকবাজারের বড় মসজিদের আশপাশে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসতেন। দিন দিন এ প্রচলন এতটাই বৃদ্ধি পাতে থাকে যে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে রুটি বিক্রির দৃশ্য দেখা যেত। বিশেষ করে, সাতরওজা এলাকার আনন্দ বেকারি, চকবাজারের বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কাবাব, রায়সাহেব বাজারের ইউসুফ বেকারি, বংশালের আল-রাজ্জাক কনফেকশনারি এবং ইসলামপুরের কুসুম বেকারিসহ অন্যান্য বেকারির বিশেষ আয়োজন এক নজরে লক্ষণীয় ছিল।
পুরান ঢাকার নবাবরাও এই দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করত। শবেবরাত উপলক্ষে তারা মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করতেন।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার কারণে এই প্রচলন কিছুটা কমে এসেছে, তবু উৎসবমুখর পরিবেশে ছোট-বড় সবাই অন্যান্য রাতের তুলনায় অনেক বেশি আনন্দমুখর হয়ে ওঠে।
সূত্র :
বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড), এমএ রহিম
ঢাকার মুসলিম ঐতিহ্য, ড. আহমেদ আবদুল্লাহ
তারিখে ফিরোজশাহী, শামস শিরাজ আফিফ
তারিখে দাউদি, আবদুল্লাহ
বাহারিস্তানে গায়েবি, মির্জা নাথান
নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি, অনুপম হায়াৎ