স্বচ্ছ কাচের ছোট্ট জলজ জগতে যেন রঙের এক অপূর্ব উৎসব! লাল, নীল, হলুদ, কমলা কিংবা বাহারি রঙের মাছগুলো আপনমনে সাঁতার কাটছে অ্যাকোয়ারিয়ামের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। পানির নিচে তাদের ছুটে চলা, বিচিত্র আকৃতি আর চোখজুড়ানো সৌন্দর্য মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে এমন একটি ছোট্ট অ্যাকোয়ারিয়াম যেমন এনে দিতে পারে প্রশান্তি, তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে তুলতে পারে এক অনন্য সম্পর্ক। রঙিন মাছের এই বর্ণিল জগৎকে ঘিরেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ অর্নামেন্টাল ফিশ ফেয়ার অ্যান্ড শো, ২০২৬’। শৌখিন মাছ পালন, অ্যাকোয়ারিয়াম শিল্প ও অ্যাকোয়াস্কেপিংকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ইস্কাটনের অ্যাবাকাস কনভেনশন সেন্টারে ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আজাদ ফিশারিজের প্রধান উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম রাজিব। এ সময় আয়োজক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও মাছপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। প্রথম দিনেই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ—সব বয়সি মানুষের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ। মেলায় রয়েছে ৬০টি স্টল। এসব স্টলে পাওয়া যাচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির শৌখিন মাছ, যার দাম ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাছের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক অ্যাকোয়ারিয়াম, উন্নত মানের ফিল্ট্রেশন সিস্টেম, মাছের খাবার, জলজ উদ্ভিদ, অ্যাকোয়াস্কেপিংয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং মেরিন অ্যাকোয়ারিয়ামের আধুনিক প্রযুক্তি। দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন পণ্যে থাকছে বিশেষ অফারও।
একেকটি স্টলে সাজানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছ। কোথাও ছোট্ট রঙিন গাপ্পি, কোথাও নজরকাড়া গোল্ডফিশ, আবার কোথাও আকার ও গঠনে ব্যতিক্রমী ফ্লাওয়ারহর্ন। এসব মাছের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে শিশুদের কাছে রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।
অ্যাকোয়াস্কেপিংয়ের মাধ্যমে পানির নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনুকরণে তৈরি করা হয় নান্দনিক জলজ দৃশ্য। পাথর, কাঠ, বালু ও জলজ উদ্ভিদের সমন্বয়ে তৈরি এসব দৃশ্য যেন কাচের ভেতর একেকটি ক্ষুদ্র প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি। মেলায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।
এছাড়া প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে বিনামূল্যে লাইভ মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম সেটআপ প্রদর্শনী। এতে সরাসরি অ্যাকোয়ারিয়াম স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ পালনের বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে নতুন করে অ্যাকোয়ারিয়াম তৈরিতে আগ্রহী ব্যক্তিরাও প্রয়োজনীয় ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছেন। মেলায় অংশ নেওয়া আজাদ ফিশারিজের প্রধান উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম রাজিব বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু একটি মাছের মেলার আয়োজন করা নয়; বরং বাংলাদেশের শৌখিন মাছ ও অ্যাকোয়ারিয়াম শিল্পকে একটি সম্মানজনক, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিল্পে পরিণত করা। নতুন প্রজন্ম যেন এই শখের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শৌখিন মাছের প্রজনন, অ্যাকোয়ারিয়াম তৈরি, মাছের খাবার উৎপাদন, জলজ উদ্ভিদ চাষ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অ্যাকোয়াস্কেপিংয়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে উঠতে পারে নতুন ব্যবসা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দেশেই উন্নত মানের শৌখিন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হলে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।